হবিগঞ্জে চাকমা গেটের আগ্রাসন: কপাট খুললেই লণ্ডভণ্ড খোয়াই তীরের জনপদ

হবিগঞ্জে চাকমা গেটের আগ্রাসন: কপাট খুললেই লণ্ডভণ্ড খোয়াই তীরের জনপদ

ফয়সল চৌধুরী,হবিগঞ্জ

১৮/০৭/২০২৬ ১৮:২০:৩৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

হবিগঞ্জবাসীর কাছে এক স্থায়ী আতঙ্কের নাম ‘চাকমা গেট’ বা চাকমাঘাট ব্যারাজ। বর্ষা মৌসুমে ভারতের উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হলেই যখন এই ব্যারাজের কপাটগুলো খুলে দেওয়া হয়, তখন ওপার থেকে নেমে আসা ঢলে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে খোয়াই নদী। আর তাতেই বুক কাঁপে খোয়াই অববাহিকার লাখো মানুষের। বছরের পর বছর ধরে ভারতের এই একতরফা পানি ব্যবস্থাপনার খেসারত দিতে হচ্ছে হবিগঞ্জের বাসিন্দাদের।


হবিগঞ্জের বাল্লা সীমান্ত দিয়ে চুনারুঘাট ও হবিগঞ্জ সদর হয়ে বয়ে যাওয়া খোয়াই নদী প্রতি বর্ষায় আতঙ্কের কারণ হলেও, এবারের বন্যা পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। পরিবেশ ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলাজুড়ে এই আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির মূল কারণ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে নির্মিত ‘চাকমাঘাট ব্যারাজ’।

নদীর ভৌগোলিক অবস্থান ও ব্যারাজের ইতিহাস


ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আঠারোমুড়া পাহাড়ের পূর্ব দিকে খোয়াই নদীর উৎপত্তি। এরপর হবিগঞ্জের বাল্লা সীমান্ত হয়ে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। মোট ১৬০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদীটির ৯৪ কিলোমিটার অংশই পড়েছে হবিগঞ্জ জেলায়।


মূলত ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ত্রিপুরার তেলিয়ামুড়া এলাকায় সম্পূর্ণ নিজেদের স্বার্থে ‘চাকমা গেট’ নামে এই ব্যারাজটি নির্মাণ করে ভারত সরকার। পানি সংরক্ষণ, সেচ সুবিধা এবং নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করা হয়।


বছরের অধিকাংশ সময় এই ব্যারাজের পানি শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত থাকলেও বর্ষাকালে চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ত্রিপুরায় অতিবৃষ্টির কারণে ব্যারেজে পানির চাপ বাড়লেই নিজেদের সুরক্ষায় হুট করে গেট খুলে পানি ছেড়ে দেয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। ফলে উজান থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ পানি হু হু করে হবিগঞ্জের খোয়াই নদীতে প্রবেশ করে নদীকে ফুঁসিয়ে তোলে। এর জেরে হবিগঞ্জ শহরসহ চুনারুঘাট ও বাহুবল উপজেলার নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের কাটাতে হয় নির্ঘুম রাত।


গত সপ্তাহে ত্রিপুরায় অতিভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলে চাকমাঘাটের সবকটি কপাট একসঙ্গে খুলে দেওয়া হয়। ফলে ওপার থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে মুহূর্তেই ভেসে যায় খোয়াই নদীর বিস্তীর্ণ অববাহিকা।


গত ৯ জুলাই পরিস্থিতি আকস্মিকভাবে ভয়াবহ রূপ নেয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে খোয়াই নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গিয়ে রাতের দিকে বিপৎসীমার ২২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। পানির এই প্রচণ্ড ও আকস্মিক চাপে সদর উপজেলার লস্করপুর এবং বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুরে খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। তবে উজান থেকে পানির চাপ কমে আসায় মাত্র একদিনের ব্যবধানে আবার নদীর পানি নেমেও যায়।


পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশকর্মী এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ত্রিপুরায় ভারী বৃষ্টির পরপরই চাকমাঘাট ব্যারাজ খুলে দেওয়ায় অতি অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ পানি খোয়াই নদী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। নদীর স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার চেয়ে পানির বেগ ও পরিমাণ বেশি থাকায় বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ নদী অববাহিকায় এই আকস্মিক ও প্রলয়ংকরী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad