ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক যেন মৃত্যুর মিছিল: দু’দিনে ৫ প্রাণহানি

সাত মাসে নিহত ২০৯

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক যেন মৃত্যুর মিছিল: দু’দিনে ৫ প্রাণহানি

হাসান কবির চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি

১০/০৮/২০২৬ ১৯:১২:২৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে থামছেই না মৃত্যুর মিছিল। বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, চালকদের ক্লান্তি ও মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের অবাধ চলাচলে সড়ক দুটি এখন এক আতঙ্কের নাম। গত দুই দিনে পৃথক দুটি দুর্ঘটনায় সিএনজি অটোরিকশাচালক ও সবজি ব্যবসায়ীসহ অন্তত ৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

আজকের সর্বশেষ দুর্ঘটনা (১০ আগস্ট, সোমবার):আজ সোমবার সকালে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রোকনপুর এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও কাঁচামালবাহী পিকআপ ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন—নবীগঞ্জের কারখানা গ্রামের সবজি ব্যবসায়ী মশহুদ আহাম্মদ (৪০), ইনাতগঞ্জ দক্ষিণ গ্রামের আবুল কাশেম (৫০) এবং ফাহিম সবজি ভাণ্ডারের কর্মচারী ময়না মিয়া (৩০)।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে কয়েকজন সবজি ব্যবসায়ী পিকআপ ভ্যানযোগে কাঁচামাল কিনতে বাহুবল যাচ্ছিলেন। রোকনপুর এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা 'লাকি পরিবহনের' একটি বাসের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মশহুদ আহাম্মদ মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় চারজনকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরে আবুল কাশেম ও ময়না মিয়া মারা যান। আহত পিকআপ চালকসহ দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। শেরপুর হাইওয়ে থানা পুলিশ দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন দুটি আটক করেছে।

মাধবপুরে ২ মৃত্যু (৯ আগস্ট):এর আগে গত রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে হবিগঞ্জের মাধবপুরের বেজুড়া এলাকায় বালুবাহী ট্রাক ও তেলবাহী লরির মুখোমুখি সংঘর্ষের পর ট্রাকটি একটি সিএনজি অটোরিকশার ওপর উল্টে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই অটোরিকশাচালক আবুল খায়ের (৪৫) নিহত হন এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ট্রাক চালকের সহকারী রিপন মিয়া (২৭)।

সাত মাসের ভয়াবহ পরিসংখ্যান ও চিত্রনিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সিলেট বিভাগীয় কমিটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) সিলেট বিভাগে ১৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৯ জন নিহত এবং ৩৬১ জন আহত হয়েছেন। যার মধ্যে শুধু ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশেই ২৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪২ জন।হাইওয়ে পুলিশের শেরপুর থানার তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে সিলেটের মহাসড়কগুলোতে ১৮৫টি দুর্ঘটনায় ১১৭ জন নিহত এবং ১৬৬ জন আহত হয়েছেন। 

গড়ে প্রতি মাসে ৩১টি দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন ২০ জন মানুষ।এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসে ১৩টি দুর্ঘটনায় ১৪ জন। মার্চ মাসে ১৬টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন। এপ্রিল মাসে ১৩টি দুর্ঘটনায় ১৪ জন। মে মাসে ২২ জন। জুন মাসে ২৯ জুলাই মাসে ১৪ জন মিলিয়ে সর্বমোট (৬ মাস)১৮৫টি দুর্ঘটনায় ১১৭ জন মৃত্যুবরণ করেন।  

দুর্ঘটনার মূল কারণ ও ঝুঁকির ক্ষেত্র: মহাসড়কের অনুসন্ধানে জানা যায়, তেলিবাজার, রশিদপুর, দয়ামীর এবং কাশিকাপন এলাকায় দুর্ঘটনার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এসব দুর্ঘটনার জন্য বিশেষজ্ঞরা ও সংশ্লিষ্টরা বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন:অবৈধ যানবাহন: মহাসড়কে আইন অমান্য করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, লেগুনা ও পিকআপ চলাচল।

চালকদের ক্লান্তি ও অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা: দীর্ঘ যাত্রায় চালকদের ক্লান্তি এবং অনেক সময় মূল চালকের বদলে অভিজ্ঞতা ছাড়া হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো।

সড়ক ও অবকাঠামোগত ত্রুটি: মহাসড়কের বিপজ্জনক বাঁক এবং ট্রাফিক নির্দেশনার অভাব।বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিং: চালকদের দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতায় নিয়ন্ত্রণ হারানো।সিলেট জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজন ও নিসচা সিলেট জেলা শাখার আহ্বায়ক জহিরুল ইসলাম মিশু জানান, নিয়মিত ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, চালকদের প্রশিক্ষণ, টানা আট ঘণ্টার বেশি ড্রাইভিং না করা এবং মহাসড়কে অটোরিকশা-লেগুনা পুরোপুরি বন্ধ করতে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এই মৃত্যুমিছিল থামানো সম্ভব নয়।

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad