মাদরাসায় বর্বরতা!
সুনামগঞ্জে লোহার শিকলে বেঁধে শিশু শাসন
একটি মাদরাসার নূরানী দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী আরাফাত। বয়স এখনও ৭ পূর্ণ হয় নি। অভিভাবকদের ইচ্ছাতে ভালো কিছুর আশায় আরাফাতকে ভর্তি করা হয় একটি মাদরাসায়। শিশু আরাফাত সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার নওধার গ্রামের হবিকুল মিয়ার ছেলে। কিন্তু মাদরাসার কঠোরতায় বাকরুদ্ধ আরাফাতের অভিভাবক। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। শাসণের নামে নিষ্ঠুর বর্বরতার এক অমানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের অবস্থিত জামিয়া ইসলামিয়া দেওয়ানগঞ্জ মাদ্রাসা। ওই মাদরাসার শিক্ষকতা করেন সাঈদ হাসান ওরফে রিপন। তিনি আরাফাত নামের ২য় শ্রেণীর ওই শিক্ষার্থীকে শাস্তি স্বরূপ পায়ে লাগিয়ে দিলেন লোহার শিকল। তাও প্রায় ৫ কেজি ওজনের। মাদরাসা ছুটির পর সেই শিকল পায়ে নিয়েই বাড়ির পথে পা বাড়ায় শিশুটি। কিন্তু নুয়ে নুয়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকা দৃশ্যটি ধরা পড়ে গ্রামের পরিচিত জনের।এই খবর চলে যায় আরাফাতের বাবার কাছে। তিনি রাস্তা দিয়ে নুয়ে নুয়ে হাঁটতে থাকা ছেলের অবস্থা দেখতে পেয়ে কারণ জানতে চান। অবশেষে আরাফাতকে সঙ্গে নিয়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ মুফতি আশরাফ আলীর কাছে ব্যাখ্যা চান বিষয়টির।
আরাফাতের সাথে মাদ্ররাসা শিক্ষকের এমন অমানবিক শাসনের ঘটনাটি ঘটে গেল ১৯ জুন বৃহস্পতিবার। রাস্তার জিজ্ঞাসার জবাবে ভয়ে ভয়ে আরাফাত তার বাবাকে জানায় জানায়, ওইদিন দুুপুরে মাদ্রাসার শিক্ষক সাঈদ হাসান অরফে রিপন তার পায়ে এই শিকল পড়িয়েছে।
মাদ্রাসা কার্যালয়ে আরাফাতের বাবা হবিকুল অধ্যক্ষ মুফতি আশরাফ আলীসহ উপস্থিত শিক্ষকদের বিষয়টি অবগত করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠান প্রধান এ ব্যাপারে উল্টো শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা বেশি দুষ্টুমি করলে বা পালিয়ে গেলে অভিভাবকরা এ ধরনের শিকল লাগিয়ে দিয়ে যান। আমরা শিকল পড়াইনা। অভিভাবকরা শিকলে আবদ্ধ রেখে গেলে আমরা দুই চারদিন অভিভাবকদের মন রক্ষার্থে এভাবে রাখি।’ হবিকুল তাৎক্ষণিক প্রতিষ্ঠান প্রধানের এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, তার ছেলে দুষ্টুমি করেনা। আর শিকল লাগানোর জন্য কাউকে কোনো অনুমিত দেননি তিনি। ওই সময় সেখানে উপস্থিত সুফিয়ান নামে আরেকজন শিক্ষার্থী জানায় তাকেও বছরখানেক আগে দুই মাস তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।
খবর পেয়ে মাদ্রাসায় ছুটে আসেন আরাফাতের মামা জসিম উদ্দিন। তখন অধ্যক্ষ জসিমের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় আরাফাতের পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত শিকলের তালাটি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু অভিযুক্ত শিক্ষক চাবি নিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় তালা খোলা যায়নি। পরে গাছতলা বাজারে নিয়ে তালা ভেঙে শিকল খোলা হয়।
আরাফাতের মামা জসিম উদ্দিন বলেন, শিকলটির ওজন অন্তত ৫ কেজি হবে। আমরা ওই শিক্ষকের বিচার চাই।
অভিযুক্ত শিক্ষক সাঈদ হাসান বলেন, আরাফাত খুব দুষ্টুমি করে আর পালিয়ে যায়। সে আমার গ্রামের সম্পর্কে ভাতিজা হওয়ায় শাসন করতে গিয়ে শিকল লাগিয়েছিলাম। আমার এমনটি করা উচিত হয়নি। এ জন্য আমি দুঃখিত।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি আশরাফ আলী এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ওই শিক্ষক আমার অজান্তে প্রতিষ্ঠানের নিয়বহিভূর্ত কাজ করেছে। ওই শিক্ষক (সাঈদ) চরম অন্যায় ও ভুল করেছে। সেই ভুলের জন্য তার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রতিষ্ঠানের সভাপতি আল্লাদ মিয়া বলেন, ওই শিক্ষককে বহিস্কার করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অধ্যক্ষকে বলা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনি রায় বলেন, একজন শিক্ষার্থীকে এভাবে শাস্তি দেওয়ার বিধান নেই। এ ব্যাপারে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: