নেপথ্যে অবৈধ ড্রেজার চক্র
শাল্লায় আগ্রাসী কুশিয়ারা নদী, শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে শত শত পরিবার
সুনামগঞ্জের শাল্লায় কুশিয়ারা নদী ক্রমেই আগ্রাসী হয়ে উঠছে। বাড়ছে নদীভাঙন, শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে শত শত পরিবার। নদীর ধার ঘেঁষে যেসব গ্রাম একসময় জীবনের হাসি–আনন্দে ভরপুর ছিল, সেসব এখন ভাঙনের আতঙ্কে নিঃশব্দ। এমন সময়ে ফয়েজুল্লাহপুর ও মার্কুলি বাজারের মাঝামাঝি স্থানে চলছে প্রকাশ্যে অবৈধ বালু উত্তোলন—দিনে-রাতে গর্জে উঠছে ড্রেজারের শব্দ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অর্থলোভী চক্রের নীরব সহযাত্রী হয়ে উঠেছে মার্কুলি নৌ–পুলিশ ফাঁড়ি। নদীর বুকে বালু খোঁড়ার শব্দ তাঁদের কানে পৌঁছায় না—কাজ চলতে থাকে দৃশ্যমানভাবেই। আর নদীর পাড় বসে বসে ঝরছে মানুষের জীবনের ঘাম ও কান্না।
বর্ষার পানি নামার পর থেকেই শাল্লা থেকে আকিল–শা বাজার পর্যন্ত নদীভাঙন যেন উন্মত্ত রূপ নিয়েছে। ঘরবাড়ি, যাবতীয় সম্বল হারানোর ভয়ে মানুষ রাতজেগে পাহারা দেয়। কিন্তু ভাঙনের মাত্র এক কিলোমিটার দূরেই চলছে বালু ব্যবসার ‘মহোৎসব’।
স্থানীয়দের ভাষায়—“নদী আমাদের জমি–ঘর টেনে নিচ্ছে, আর ড্রেজারগুলো নদীর বুক ফুঁড়ে আরও ক্ষত তৈরি করছে।”
সূত্র জানায়, প্রভাবশালী মঈনউদ্দীন মেম্বারের সহায়তায় একটি চক্র নিয়মিতভাবে বালু তুলছে। তাঁরা দাবি করেন, নদীর তলদেশ থেকে এভাবে বালু তুলতে থাকলে নদী তার স্বাভাবিক পথ হারায়—গতি বদলে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়।
অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মধ্যে দোষারোপ আর পাল্টা অভিযোগ এখন নিয়মিত ঘটনা। মঈনউদ্দীন মেম্বার মোতাহার আলীর দিকে আঙুল তুললেও পরে আরেকজন সোহেলকে দোষী বলে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। অন্যদিকে মোতাহার আলী বলেন, “আগে ভুল করেছি, সাজাও খেটেছি। এখন আর জড়িত নই। প্রতিদিন মঈনউদ্দীন মেম্বার, ফজল আর মিঠুর ড্রেজার চলে। থানাতেও জানিয়েছি, লাভ হয়নি।”
স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় অভিযোগ—মার্কুলি নৌ–পুলিশ ফাঁড়ির রহস্যজনক নীরবতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা প্রতিদিন ভাঙনের ভয়ে কাঁপি। নদী আমাদের ঘর কেটে নেয়, আর পুলিশ ফাঁড়ির পাশে অবৈধ ড্রেজার চলে। বোঝাই যায়, কারা কার সঙ্গে আছে।”
নৌ–পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক কাওসার গাজী বলেন, “বালু উত্তোলনের তথ্য আমাদের জানা নেই। কেউ জানালে ব্যবস্থা নেব।”
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন—কুশিয়ারা নদীর এভাবে ক্ষত সৃষ্টি হলে শুধু ভাঙন নয়, পুরো হাওরাঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবিকা দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত হবে।
শাল্লা থানার ওসি শফিকুর রহমান জানান, “বিষয়টি জানার পর রাতে পুলিশ পাঠানো হয়, তবে কাউকে পাওয়া যায়নি। অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
এলাকাবাসীর দাবি,“আমরা নদীর সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছি। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে হয়তো গ্রামই থাকবে না।”
প্রিতম দাস
মন্তব্য করুন: