সুনামগঞ্জে ভোটের ঝড়: বিতর্কিত মাঝি নাকি নতুন তরী?
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সুনামগঞ্জের পাঁচটি আসনেই বইছে আগাম নির্বাচনী হাওয়া—কখনো গরম, কখনো আবার সন্দেহের কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে রাজনীতি। হাট-বাজার, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক আড্ডা—সবখানেই ভোটের হিসাব-নিকাশ। তবে এই উত্তাপের মাঝেই সুনামগঞ্জ-১ ও সুনামগঞ্জ-৩ আসন নিয়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোটে দেখা দিয়েছে অস্বস্তিকর নীরবতা আর চাপা ক্ষোভ। কারণ একটাই—বিতর্কিত ‘দলবদল’ রাজনীতি আর ‘ডামি নির্বাচনের’ স্মৃতি।
সুনামগঞ্জ-১: রাজনীতির ইউ-টার্নে ধোঁয়াশা
ধর্মপাশা–তাহিরপুর–মধ্যনগর–জামালগঞ্জ নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-১ আসনে চিকিৎসক-রাজনীতিবিদ ডা. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী যেন রাজনীতির এক চলমান ইউ-টার্ন। ছাত্রদল থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা—সেই পথচলার পর ২০১৮ সালে মনোনয়ন না পেয়ে বিকল্পধারায় যোগ, এরপর আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকে পড়ার অভিযোগ, আর ২০২৪ সালের তথাকথিত ‘ডামি নির্বাচনে’ পরোক্ষ সমর্থনের গুঞ্জন—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এখন ধাঁধার মতো।
সবশেষ ২০২৫ সালের নভেম্বরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে যোগ দিয়ে আটদলীয় জোটের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন তিনি। কিন্তু তৃণমূলে প্রশ্ন উঠেছে—রাজনীতিতে বারবার জামা বদলালে কি ভোটারের মন বদলায়?
জামালগঞ্জের ভোটার ফখর উদ্দিনের ভাষায়,“২০০৮ সালে জোটের জোয়ারে তিনি ভোট পেয়েছিলেন। এখন এত ডিগবাজি দিয়ে সেই জোয়ারে নৌকা নয়, বরং ভাঙন ধরেছে।”
এর বিপরীতে জেলা জামায়াতের আমীর উপাধ্যক্ষ মাওলানা তোফায়েল আহমদ খাঁনকে তুলনামূলক ‘নির্ভার মাঝি’ হিসেবে দেখছেন অনেকে। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য,“বিতর্কিত কাউকে হঠাৎ জোটের প্রার্থী বানালে ভোটাররা চোখ বন্ধ করে মেনে নেবে—এই ধারণা ভুল।”
সুনামগঞ্জ-৩: অভিজ্ঞতা বনাম গ্রহণযোগ্যতা
জগন্নাথপুর–শান্তিগঞ্জ নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৩ আসনে লড়াই আরও জটিল। এখানে একদিকে সাবেক এমপি মাওলানা শাহীনূর পাশা চৌধুরী, অন্যদিকে জামায়াতের অ্যাডভোকেট ইয়াসিন খান এবং খেলাফত মজলিস নেতা শেখ মুশতাক আহমেদ। তবে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন শাহীনূর পাশা চৌধুরী।
২০২৪ সালের নির্বাচনে তৃণমূল বিএনপি থেকে অংশ নিয়ে জামানত হারানোর পর এখন তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর হিসেবে জোটের টিকিট চাইছেন। এতে তৃণমূলে প্রশ্ন—একবার যে ভোটার মুখ ফিরিয়েছে, এবার কি তারা আবার হাত ধরবে?
শান্তিগঞ্জের ভোটার এম জে কে শাহজাহানের মন্তব্যে সেই সংশয় স্পষ্ট,“একজন আলেম হয়েও ডামি নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি নিজের গ্রহণযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। তাকে দিলে জোটের ফল ভালো হবে—এমন বিশ্বাস নেই।”
এর বিপরীতে অ্যাডভোকেট ইয়াসিন খান গত ছয় মাস ধরে মাঠে নেমে পড়েছেন। গ্রাম থেকে গ্রাম, উঠান বৈঠক থেকে বাজার—তারুণ্য আর তুলনামূলক ক্লিন ইমেজে তিনি ধীরে ধীরে পরিচিত মুখ হয়ে উঠছেন। ইয়াসিন খানের সাফ কথা,“বিতর্কিত প্রার্থী চাপিয়ে দিলে মানুষ প্রতীক নয়, প্রতিবাদই বেছে নেবে।”
জোটের সামনে বড় পরীক্ষা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আটদলীয় জোট এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে। পরিচিত কিন্তু বিতর্কিত ‘পুরোনো মুখ’ নাকি কম পরিচিত হলেও মাঠে সক্রিয় ও তুলনামূলক স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রার্থী—এই দুইয়ের মাঝে সঠিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে জোটের ভবিষ্যৎ।
মাওলানা শাহীনূর পাশা চৌধুরী অবশ্য নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেছেন, গুমের হুমকি ও কৌশলগত বাস্তবতার কারণেই তিনি আগের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। তবে ভোটারদের কথায় তাতে খুব একটা সান্ত্বনা মিলছে না।
সাধারণ মানুষের ভাষায়, এবার তারা আর শুধু প্রতীক দেখবেন না—দেখবেন প্রার্থীর নৈতিকতা, ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। ফলে সুনামগঞ্জের রাজনীতিতে প্রশ্নটা এখন সোজা কিন্তু কঠিন—আটদলীয় জোট কি মাঠের বাস্তবতা মেনে নতুন মুখে বাজি ধরবে, নাকি বিতর্কিত মাঝির হাতেই আবার তরী তুলে দিয়ে ভাঙা ঘাটে ভেড়ানোর ঝুঁকি নেবে?
প্রীতম দাস
মন্তব্য করুন: