সুনামগঞ্জ সীমান্তে অস্থির এক বছর: হত্যা, পুশইন, চোরাচালান ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
সুনামগঞ্জ জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে ছয়টি উপজেলার সঙ্গে ভারতের প্রায় ১২০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যনগর উপজেলার ৭ কিলোমিটার সীমান্ত নেত্রকোনা ব্যাটালিয়ন এবং ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার ২৩ কিলোমিটার সীমান্ত সিলেট ব্যাটালিয়নের অধীনে। বাকি প্রায় ৯০ কিলোমিটার সীমান্তের দায়িত্বে রয়েছে সুনামগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (২৮ বিজিবি)। এই ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে ৮৯ কিলোমিটার স্থলসীমান্ত ও ১ কিলোমিটার জলসীমান্ত।
জেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো অত্যন্ত দুর্গম ও পাহাড়ি। অনেক স্থানে কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান সহজ হয়ে উঠেছে। ফলে সারা বছরজুড়েই সুনামগঞ্জ সীমান্তে পুশইন, বিএসএফ ও গারো-খাসিয়াদের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার এবং সীমান্ত বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আলোচনায় ছিল।
নিহত ও দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা
চলতি বছরে বিএসএফ ও গারো-খাসিয়াদের গুলিতে তিনজন বাংলাদেশি নিহত হন। এছাড়া চোরাই কয়লা আনতে গিয়ে পাথরের গর্তে পড়ে মারা যান আরও দুই শ্রমিক।
৮ জানুয়ারি বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার চিনাকান্দি সীমান্ত এলাকায় গুলিতে নিহত হন মো. সাইদুল ইসলাম। তিনি ধনপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। অবৈধভাবে সুপারি ভারতে পাঠানোর সময় বুকে ও পেটে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। তবে গুলি বিএসএফ নাকি ভারতীয় গারোরা করেছে—তা নিশ্চিত করতে পারেনি বিজিবি।
১২ ফেব্রুয়ারি তাহিরপুর সীমান্তে চোরাই কয়লা আনতে গিয়ে পাথরের গর্তে পড়ে মাথায় আঘাতে মারা যান কয়লা শ্রমিক মো. রজব আলী (৫০)।
১২ এপ্রিল দোয়ারাবাজার সীমান্ত থেকে ভারতের অভ্যন্তরে সুপারি চুরি করতে গিয়ে খাসিয়াদের গুলিতে নিহত হন কুটি মিয়া (৫০)।
৫ মে তাহিরপুর সীমান্তে কয়লা উত্তোলনের সময় পাথরের চাপায় প্রাণ হারান আরেক শ্রমিক মো. নুরু মিয়া (৪০)।
১১ জুলাই দোয়ারাবাজার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন শফিকুল ইসলাম (৪৫)। গরু পারাপারের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে হাসপাতালে মারা যান তিনি।
বৈদ্যুতিক ফাঁদে ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু
৩১ মার্চ দোয়ারাবাজার উপজেলার টেবলাই গ্রামে ফসলি জমিতে পাতা বৈদ্যুতিক ইঁদুরের ফাঁদে পড়ে মারা যান ভারতের মেঘালয় রাজ্যের যুবক সারভেস মারাক (২৮)। পরে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে লাশ হস্তান্তর করা হয়।
পুশইন ও অনুপ্রবেশ
চলতি বছরে চার দফায় ছাতক সীমান্ত দিয়ে ৭৪ জন বাংলাদেশিকে পুশইন করে বিএসএফ। ২৮ মে, ১২ জুন, ২৪ জুন ও সর্বশেষ ১৬ জুলাই এসব ঘটনা ঘটে। বিজিবির প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, পুশইনকৃত সবাই বাংলাদেশি নাগরিক, যারা বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আদালতের রায় ছাড়া কাউকে ঠেলে পাঠানো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল।
অস্ত্র, অর্থ ও চোরাচালান
বছরজুড়ে সীমান্তে লাখ-কোটি টাকার চোরাই পণ্য জব্দ করা হয়েছে।
৫ মে ভারতীয় ৩৪ হাজার রুপি সহ এক ব্যক্তিকে আটক
১৯ জুলাই ২০ হাজার ২০০ রুপি সহ মো. কামাল হোসেন আটক
২৮ আগস্ট দোয়ারাবাজার সীমান্ত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি একটি রিভলবার ও ৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার
১৫ নভেম্বর ডিবি পুলিশের অভিযানে ৯৫০ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার
সীমান্ত বাণিজ্য ও হত্যাকাণ্ড
১৪ ডিসেম্বর দোয়ারাবাজার সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আহাদ মিয়া হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে বেড়াহীন এলাকা, দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও দুই দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে সুনামগঞ্জ সীমান্ত দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার করার দাবি উঠেছে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: