সুনামগঞ্জে ফসল রক্ষা বাঁধে মাটি না ফেলেই দেওয়া হয়েছে নতুনরূপ
Led Bottom Ad

দেড় কোটি টাকার বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন

সুনামগঞ্জে ফসল রক্ষা বাঁধে মাটি না ফেলেই দেওয়া হয়েছে নতুনরূপ

নিজস্ব প্রতিনিধি,সুনামগঞ্জ

১৪/০১/২০২৬ ১২:১৬:০১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উথারিয়া ফসলরক্ষা বাঁধে এখনো একমুঠো মাটিও ফেলা হয়নি। বাঁধটি সম্পূর্ণ অক্ষত থাকলেও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সম্প্রতি এস্কেভেটর মেশিন দিয়ে পুরোনো বাঁধ খুঁড়ে একে ‘নতুন’ রূপ দেওয়া হয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় নতুন করে মাটি ফেলা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কোথাও নতুন মাটির স্তর বা কাটার চিহ্ন নেই।

দেখার হাওরের শান্তিগঞ্জ উপজেলার আস্তমা এলাকায় ডাইক–১ ও ডাইক–২ নামে পরিচিত মহাসিং নদীর দুই তীরের ৫ হাজার ৬৯৫ মিটার দীর্ঘ অক্ষত বাঁধে চলতি মৌসুমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা। অথচ বাঁধটির অধিকাংশ অংশই ঝুঁকিমুক্ত ও প্রায় অক্ষত রয়েছে।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাব-ডিভিশনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, দোয়ারাবাজার ও ছাতক—এই চার উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত দেখার হাওরে প্রায় ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়। হাওরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ হিসেবে পরিচিত উথারিয়া বাঁধ ও ক্লোজার। চলতি মৌসুমে শান্তিগঞ্জ অংশে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মহাসিং নদীর তীরবর্তী উথারিয়া এলাকায় ৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়েছে।

সরকারিভাবে উথারিয়া এলাকায় তিনটি ক্লোজারকে বড় ভাঙন হিসেবে দেখানো হলেও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভাঙনগুলো ছোট এবং ঝুঁকিমুক্ত। ক্লোজারগুলো মোটরসাইকেলে অনায়াসে পার হওয়া যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য ড্রেসিং করলেই এসব বাঁধ টেকসই করা সম্ভব ছিল। কিন্তু পুরোনো অক্ষত বাঁধ খুঁড়ে কৃত্রিমভাবে ‘নতুন’ রূপ দিয়ে বিপুল সরকারি বরাদ্দ লোপাটের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

গত শুক্রবার সকালে আস্তমা গ্রামে মহাসিং নদীর তীরবর্তী উথারিয়া বাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের শেষ প্রান্ত থেকেই ফসলরক্ষা বাঁধ শুরু। উথারিয়া ক্লোজার পর্যন্ত সাতটি প্রকল্পের আওতাভুক্ত সব বাঁধই প্রায় অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। কোথাও নতুন মাটি ফেলার কোনো আলামত নেই।

হাওরে কাজ করা একাধিক কৃষক জানান, গত সপ্তাহে পিআইসি’র লোকজন এস্কেভেটর মেশিন এনে অক্ষত বাঁধ খুঁড়ে গেছে। এতে মাটি ছোট ছোট চাকায় পরিণত হয়েছে, যা দেখে মনে হয় নতুন মাটি ফেলা হয়েছে। বাস্তবে শুধু দুরমুজ দিলেই কাজ শেষ দেখানো যাবে। তাদের প্রশ্ন—এক মুঠো মাটি না ফেলেই কীভাবে এত বড় বরাদ্দের কাজ দেখানো হবে?

আস্তমা গ্রামের কৃষক আজির উদ্দিন বলেন, “উথারিয়া বান্দ আর পাশের বান্দগুলা সব ঠিক আছে। গত সাপ্তায় মেশিন দি পুরান বান্দ খুঁড়াইছে, অখন দেখত নয়া লাগে। কিন্তু কাজ ত অইছে না।”

ইসলামপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল হেকিম বলেন, “উথারিয়া অইলো দেখার আউরের আসল বান্দ। ই বান্দ ভাঙলে পুরা আউর ডুবি যায়। ইবার অখনও মাটি ফালাইছেনা, খালি পুরান বান্দ খুঁড়ছে।”

আস্তমা গ্রামের আরেক কৃষক ফরহাদ হোসেন বলেন, বাঁধগুলো এখনই মনোযোগ দিয়ে সামান্য সংস্কার করলে টেকসই হতো। কিন্তু নতুন মাটি না দিয়ে উল্টো ভালো বাঁধ খুঁড়ে ফেলা হয়েছে। গাড়ি চলাচলের অজুহাত দিয়ে বাঁধ সমান করার কথা বলা হয়েছে।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, “কয়েক যুগ ধরে হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ হচ্ছে। আগে কখনো মাটি না ফেলে শুধু খুঁড়ে কাজ দেখানোর এই অভিনব পদ্ধতি ছিল না। এখন বলা হচ্ছে, মাটি না খুঁড়লে নতুন মাটি বসবে না। আসলে এভাবেই প্রকল্প বানিয়ে সরকারি বরাদ্দ লোপাট করা হচ্ছে।”

এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাব-ডিভিশনাল অফিসার কামরুজ্জামান মোহন বলেন, উথারিয়া এলাকায় সাতটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে এবং তিনটি ক্লোজারে কাজ শুরু হয়েছে। পুরোনো বাঁধ খুঁড়ে নতুন দেখানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাঁধ টেকসই করার জন্যই খুঁড়ে দেওয়া হয়। সার্ভেয়াররা যথাযথ প্রাক্কলন করেছেন। এখানে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি।”

তবে স্থানীয় কৃষকদের আশঙ্কা, এভাবে সময় নষ্ট করে কাগুজে কাজ দেখানো হলে আগাম বন্যায় দেখার হাওরের হাজার হাজার হেক্টর বোরো ফসল ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad