সুনামগঞ্জে বাঁধ নির্মাণে তুঘলকি কাণ্ড: ৭০% কাজ শেষেও কার্যাদেশ বাতিল, নেপথ্যে কারা?
Led Bottom Ad

সুনামগঞ্জে বাঁধ নির্মাণে তুঘলকি কাণ্ড: ৭০% কাজ শেষেও কার্যাদেশ বাতিল, নেপথ্যে কারা?

প্রীতম দাস, সুনামগঞ্জ

১৯/০২/২০২৬ ১৬:২৪:১৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে নজিরবিহীন প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে ‘পকেট কমিটি’ গঠনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম মেনে প্রকল্পের বড় অংশ সম্পন্ন করার পরও রহস্যজনকভাবে ১২২নং ও ৭১নং পিআইসি’র (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) কার্যাদেশ বাতিল করায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। অন্যদিকে, ৭০নং পিআইসিতে জমিহীন ব্যক্তি এবং হত্যা মামলার আসামিকে নেতৃত্বে আনার মতো জালিয়াতির তথ্য ফাঁস হওয়ায় প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

​অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছায়ার হাওড় উপ-প্রকল্পের আওতায় জগন্নাথপুর হতে বিষ্ণুপুর নতুনহাটি (১২২নং) এবং বিষ্ণুপুর নতুনহাটি হতে সেচ পাম্প পর্যন্ত (৭১নং) পিআইসি গঠন করা হয়। নীতিমালা মেনে গঠিত এই কমিটিগুলো বৈধ কার্যাদেশ (Work Order) পেয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দ্রুত গতিতে কাজ শুরু করে।

​১২২নং পিআইসি’র সদস্য রাধাগোবিন্দ দাস জানান, তারা ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ মাটির কাজ শেষ করেছেন। একইভাবে ৭১নং পিআইসি’র সদস্য প্রসেনজিত দাস জানান, তাদের প্রকল্পের ৩০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু কোনো লিখিত কারণ ছাড়াই হঠাৎ শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় উপ-সহকারী প্রকৌশলী মৌখিকভাবে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। পরে তাদের বৈধ কার্যাদেশ বাতিল করে অন্য ব্যক্তিদের নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে প্রশাসনের একটি মহল এই বেআইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।

​সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অনিয়ম ধরা পড়েছে ৭০নং পিআইসি গঠন নিয়ে। কৃষক শনিলাল দাসের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, এই কমিটির সদস্য সচিব রাজেন্দ্র চন্দ্র দাসের প্রকল্পের আওতায় কোনো জমি নেই। অন্যের জমি বা বিক্রিত সম্পত্তির ভুয়া খতিয়ান দেখিয়ে তিনি কমিটিতে স্থান করে নিয়েছেন।

​ভয়াবহ তথ্য হলো, এই কমিটির সভাপতি প্রদীপ চন্দ্র দাস একজন কুখ্যাত অপরাধী এবং উত্তরা পূর্ব থানায় দায়েরকৃত একটি হত্যা মামলার (মামলা নং- ১৩, ২৬/০৯/২০২৪ইং) এজাহারভুক্ত আসামি। একজন চিহ্নিত অপরাধী এবং ভূমিহীন ব্যক্তি কীভাবে হাওর রক্ষা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হলেন, তা নিয়ে এলাকায় তোলপাড় চলছে।

​বারবার অভিযোগ দিয়েও কোনো সুরাহা না পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাওরের কৃষকরা। গত ৮ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট প্রথম অভিযোগ দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে ১৯ ফেব্রুয়ারি পুনরায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হন তারা। ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, সকাল থেকে জেলা প্রশাসকের সাথে দেখা করার জন্য তারা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা এবং বারবার আকুতি জানানো সত্ত্বেও তার দেখা পাননি।

​এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এবং কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. ইলিয়াস মিয়া-র অফিসিয়াল মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কোনো সাড়া বা আশ্বস্ত করার মতো বক্তব্য না মেলায় আন্দোলনরত কৃষকদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

​শাল্লা উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ওবায়দুল হক বলেন, "আমরা নীতিমালার আলোকেই কাজ করছি। ১২২ ও ৭১ নং পিআইসি’র কাজে কিছু কারিগরি ত্রুটি ও স্থানীয় বিরোধের কারণে কাজ বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নতুন কমিটি দেওয়া হয়েছে।" তবে কাজ চলাকালীন কার্যাদেশ বাতিলের যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

​হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বলছেন, পিআইসি গঠনে অনিয়ম সুনামগঞ্জের দীর্ঘদিনের ব্যাধি হলেও কাজ চলমান অবস্থায় বাতিল করা এবং খুনের আসামিকে দায়িত্ব দেওয়া নজিরবিহীন। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না হলে ছায়ার হাওরের হাজার হাজার একর বোরো ফসল আসন্ন বর্ষায় অকাল ডুবির ঝুঁকিতে পড়বে।

​প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত সরজমিনে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস না মিললে সুনামগঞ্জের কৃষকরা কঠোর রাজপথের আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad
Led Bottom Ad