ধ্বংসের শেষ প্রান্তে সিলেটের শাহ আরেফিন টিলা
Led Bottom Ad

পাথর-খেকোদের মহোৎসব

ধ্বংসের শেষ প্রান্তে সিলেটের শাহ আরেফিন টিলা

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

০৬/০৫/২০২৬ ১৭:২১:৪৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

এক সময় সবুজে ঢাকা সুউচ্চ যে টিলাটি ছিল আধ্যাত্মিক সাধক হযরত শাহ আরেফিনের (রহ.) স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র স্থান, আজ তা পাথর-খেকোদের তাণ্ডবে এক বিশাল মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চিকাডহর মৌজার এই শাহ আরেফিন টিলাটি গত দুই দশকে লুটেরাদের থাবায় হারিয়েছে তার অস্তিত্ব। বর্তমানে ১৩৭ একরের এই টিলা এলাকায় অন্তত ১০০টি বিশালাকার গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, যার গভীরতা ২০ থেকে ৩০০ ফুট পর্যন্ত। স্থানীয়রা বলছেন, টিলা এখন আর টিলা নেই, তা যেন এক কৃত্রিম ‘সাগরে’ পরিণত হয়েছে।

ধর্মীয় ঐতিহ্যের বিনাশ:

প্রায় ৭০০ বছর আগে হযরত শাহ জালালের (রহ.) সফরসঙ্গী হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) এই টিলায় অবস্থান করেছিলেন বলে লোকমুখে প্রচলিত। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে এখানে একটি আস্তানা ও মসজিদ গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরের লাগামহীন পাথর উত্তোলনের ফলে সেই আস্তানা, মসজিদ ও কবরস্থান সবকিছুই আজ ধ্বংসস্তূপ। পাথর-খেকোরা ধর্মীয় অনুভূতির তোয়াক্কা না করে আস্তানা সংলগ্ন এলাকা থেকেও কয়েক শ ফুট গভীর করে পাথর তুলে নিয়েছে।

লুটপাটের নেপথ্যে ‘বোমা মেশিন’ ও ‘ওসির লাইন’:

আদালত নিষিদ্ধ শক্তিশালী ‘বোমা মেশিন’ দিয়ে গত কয়েক বছরে টিলাটি কঙ্কালসার করে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা এবং প্রশাসনের একশ্রেণির অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজশে এই লুটপাট চলে। রাতের আঁধারে ট্রলি ও ট্রাক্টরে করে পাথর যাচ্ছে ভোলাগঞ্জের ক্র্যাশার মিলগুলোতে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি পাথরবাহী ট্রলি থেকে পুলিশকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা দিতে হয়। এমনকি মাঝে মাঝে ‘ওসির লাইন’ নাম দিয়ে পুলিশের তদারকিতেই শত শত ট্রাক্টর পাথর পাচার করে। যদিও পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে টিলা:

পাথর উত্তোলনের জন্য তৈরি করা এসব গভীর গর্তে মাটি ধসে ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েক শ। পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এবং পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নেতারা একে ‘পরিবেশগত গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। টিলা ধসের কারণে পাশের বসতভিটাগুলোও এখন চরম ঝুঁকির মুখে।

পাথর লুটের অর্থনীতি:

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টিলা থেকে লুট করা প্রতি ঘনফুট পাথর মিল মালিকদের কাছে ৯০ থেকে ৯২ টাকায় বিক্রি হয়। পরে ক্র্যাশার মিলে সেগুলো ভেঙে আকারভেদে ১৩০ থেকে ১৬২ টাকা পর্যন্ত দামে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। অবৈধ এই বাণিজ্যের কারণে সরকার শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারালেও পকেট ভারী হচ্ছে স্থানীয় সিন্ডিকেটের।

প্রশাসনের বক্তব্য:

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম টিলাটির অবস্থা দেখে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “টিলা তো নেই, এটাকে সাগর বানিয়ে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় লোকজন ও সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট অত্যন্ত বেপরোয়া। আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।” অন্যদিকে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জনগণের প্রত্যাশা:

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর লুটপাটের তীব্রতা আরও বেড়েছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, শুধু লোকদেখানো অভিযান বা মামলা নয়, বরং শাহ আরেফিন টিলাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এবং অবশিষ্ট অংশটুকু রক্ষায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর রাজনৈতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। তা না হলে মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাবে শাহ আরেফিনের স্মৃতিধন্য এই পাহাড়।


এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad