সুনামগঞ্জে ফসল রক্ষা বাঁধে ‘পুকুরচুরি’: অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিযোগিতায় বিপর্যস্ত হাওরবাসী
সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে এবার রেকর্ড অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত সময়সীমা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পার হয়ে গেলেও অনেক প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি, এমনকি অনেক জায়গায় কাজ শুরুই হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকার এই প্রকল্পের সুফল নিয়ে চরম শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দিরাই ও শাল্লা উপজেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা যায়, সম্পূর্ণ কাবিটা নীতিমালা পরিপন্থী কাজ চলছে। উদগল হাওরের মাছুয়ার কাড়া ক্লোজারসহ একাধিক প্রকল্পে বাঁধের একেবারে গোড়া থেকে মাটি কেটে দায়সারা কাজ চালানো হচ্ছে। আবার অনেক জায়গায় অক্ষত ও শক্তিশালী বাঁধকে এক্সকাভেটর দিয়ে খুঁচিয়ে নতুন করে বরাদ্দ জায়েজের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দিরাইয়ের বরাম হাওরের ৩০ নম্বর প্রকল্পে বনিবনা না হওয়ায় কাজ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
পিআইসি বণ্টনে বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে শাল্লা ও জামালগঞ্জ উপজেলায়। ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, যারা মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে পেরেছে, কেবল তাদেরই পিআইসি দেওয়া হয়েছে। শাল্লা কাবিটা স্কিম বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সদস্য পাবেল মিয়ার দাবি, পিআইসি বিক্রির এই মহোৎসবের মূল হোতা স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ও পাউবোর শাখা কর্মকর্তারা (এসও)। স্থানীয় কৃষক ও প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ দিয়ে এনজিও কর্মী ও বহিরাগতদের হাতে এসব প্রকল্প তুলে দেওয়া হয়েছে।
জামালগঞ্জের এক কৃষক অভিযোগ করেন, এসও সরাসরি ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেছেন। যারা দালালি করতে পারে, তাদেরই বেশি বরাদ্দের পিআইসি দেওয়া হয়েছে। পাউবো সূত্রমতে, ১২টি উপজেলার ৭১০টি প্রকল্পে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দিরাই ও শাল্লা উপজেলাতেই বরাদ্দ প্রায় ৫৯ কোটি টাকা।
সুনামগঞ্জ জেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি মো. ইয়াকুব বখত বহলুল বলেন, “বিগত বছরের তুলনায় এবার রেকর্ড দুর্নীতি হয়েছে। অক্ষত বাঁধ খুঁড়ে বরাদ্দ জায়েজের চেষ্টা চলছে। আমরা এই অনিয়মের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস জানান, সময়মতো বিল না পাওয়ায় কাজের গতি কম। কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার দায় এড়িয়ে বলেন, “অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে ইউএনও ও এসও ভালো জানেন, আমরা এসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না।”
দ্রুততম সময়ে টেকসই কাজ সম্পন্ন না হলে আসন্ন বোরো মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের মুখে হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন ও পাউবোর কর্তাব্যক্তিদের এই উদাসীনতা ও একে অপরের ওপর দায় চাপানোর প্রবণতায় ক্ষুব্ধ হাওরপারের কৃষকরা।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: