আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও মালিকপক্ষের বিরোধ
দিরাইয়ে মাঠেই নষ্ট হচ্ছে সুজাত মিয়ার ১০ কিয়ার জমির ধান
আদালতের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নোটিশ এবং জমির মালিকপক্ষের অভ্যন্তরীণ বিরোধের নির্মম বলির শিকার হয়েছেন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামের এক প্রান্তিক বর্গাচাষী। ঋণের বোঝা হালকা করার স্বপ্ন নিয়ে চাষ করা কৃষক সুজাত মিয়ার হারিয়া বিল হাওরের ১০ কিয়ার (৩০০ শতাংশ) জমির পাকা বোরো ধান এখন আইনি মারপ্যাঁচে মাঠেই লুটিয়ে পড়ছে, আর তা খাচ্ছে গবাদিপশু। ফসল কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতায় চোখের সামনে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য বিনষ্ট হওয়ার এই ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নাচনি গ্রামের মৃত হাজী রুস্তম উল্লার বড় মেয়ে রুপবান বিবির কাছ থেকে বার্ষিক ৫০ মণ ধানের চুক্তিতে এই জমি বর্গা নিয়েছিলেন সুজাত মিয়া। বিভিন্ন এনজিও ও মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে প্রায় ২ লক্ষ টাকা ঋণ করে জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে আবাদ করেন তিনি। সুনামগঞ্জের অধিকাংশ নিচু হাওর আগাম বন্যায় তলিয়ে গেলেও সুজাত মিয়ার উঁচু জমির ফসল অক্ষত ও সোনালী রঙে রূপ নেয়। ঠিক তখনই ভূমি মালিক রুপবান বিবির ভাই, লন্ডন প্রবাসী আলা উদ্দিনের পক্ষে জনৈক মাহবুবুর রহমান সুনামগঞ্জ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। আদালত উক্ত জমিতে ১৪৪ ধারার সমতুল্য স্থিতাবস্থা জারির নোটিশ দিলে ধান কাটা বন্ধ হয়ে যায়। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে আগামী ২৬ জুলাই, কিন্তু ধানের জীবনচক্র অনুযায়ী জুলাই মাস পর্যন্ত পাকা ধান মাঠে টিকে থাকা অসম্ভব। চোখের সামনে ফসল নষ্ট হতে দেখে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুজাত মিয়া বলেন, "আমি দিনমজুর মানুষ, দুই লাখ টাকা ঋণ কইরা আবাদ করছিলাম। আদালতের নোটিশ আমারে ভাতে মারল। অহন পাওনাদারদের ভয়ে ঘরে থাকতে পারছি না।" জমির দাবিদার রুপবান বিবিও তাঁর ভাইয়ের এই ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে বর্গাচাষীর পাশে দাঁড়িয়েছেন।
এদিকে মামলার বাদী মাহবুবুর রহমানের দাবি, আদালত ১৪৪ ধারা জারি করার পর থানার এএসআই মো. বিল্লাল উদ্দিন ভূইয়া এসে স্থানীয় মেম্বার শামীম মিয়া ও বিএনপি নেতা দারোগা ভইয়ের জিম্মায় সুজাতকে ধান কাটার নির্দেশ দিয়েছিলেন; কিন্তু সুজাত ধান কাটেনি। তবে সুজাত মিয়ার দাবি, প্রতিপক্ষের প্রকাশ্য হুমকি ও বাধার মুখে কোনো জিম্মাদারের উপস্থিতিতেই ধান কাটা সম্ভব হয়নি।
দিরাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ তৎপর ছিল এবং ফসল যেন নষ্ট না হয় সেজন্য সুজাত মিয়াকে একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল; তবে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সুশীল সমাজ ও কৃষক নেতারা এই ঘটনাকে 'প্রশাসনিক ব্যর্থতা' হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালতের বিশেষ অনুমতি বা নির্বাহী আদেশে ফসল কেটে তৃতীয় কোনো নিরপেক্ষ পক্ষের জিম্মায় রাখার আইনি বিধান থাকলেও এখানে তা করা হয়নি। তাঁরা অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, সুজাত মিয়ার ক্ষতিপূরণ এবং তাঁকে সরকারি জরুরি সহায়তার আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
প্রীতম দাস/এ রহমান
মন্তব্য করুন: