মাধবপুরে সালিশি বিচারে ভিডিও ধারণ নিয়ে সংঘর্ষ: আহত অন্তত ৩০
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় একটি ঘরোয়া সালিশি বৈঠক চলাকালে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করাকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে; দফায় দফায় হওয়া এই হিংসাত্মক সংঘাত ও দেশীয় অস্ত্রের লড়াইয়ে নারীসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেল থেকে শুরু হয়ে টানা রাত ৯টা পর্যন্ত উপজেলার আন্দিউড়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত খরকি গ্রামে এই রণক্ষেত্র ও দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খরকি গ্রামের বাসিন্দা কালাকারীর ছেলে আহমদের মালিকানাধীন রাজধানী ঢাকার একটি ফার্নিচার দোকান থেকে পবিত্র ঈদুল আজহার আগে একই গ্রামের মুর্শেদ কামালের ছেলে তোফাজ্জল (৩৫) বিশেষ প্রয়োজনে কিছু টাকা নিয়ে যান; পরবর্তীতে দীর্ঘদিনেও সেই পাওনা টাকা ফেরত না দেওয়া এবং আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে আহমদ ও তোফাজ্জলের পরিবারের মধ্যে চরম বিরোধের সৃষ্টি হয়। উক্ত অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও পাওনা টাকা আদায়ের স্থায়ী নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে খরকি গ্রামের স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও মুরুব্বিদের উপস্থিতিতে একটি উন্মুক্ত নালিশি বিচার বা সালিশ বৈঠক বসে; কিন্তু বিচার চলাকালীন সময়েই হুট করে একপক্ষের এক যুবক নিজের মোবাইল ফোনে পুরো সালিশের দৃশ্য ভিডিও ধারণ করা শুরু করলে অপরপক্ষের লোকজন তাতে তীব্র আপত্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই ভিডিও করাকে কেন্দ্র করে সালিশের ভেতরেই উভয় পক্ষের যুবকদের মধ্যে প্রথমে তীব্র তর্ক-বিতর্ক, কথা কাটাকাটি ও উসকানিমূলক স্লোগান পাল্টা-স্লোগান শুরু হয় এবং তা একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উভয় পক্ষের কয়েকশ সমর্থকের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী ও ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নেয়।
ভিডিও ধারণের এই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংঘাতের জেরে উভয় পক্ষের লোকজন লাঠিসোঁটা, ফিকল ও ধারালো দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গ্রামের প্রধান সড়কে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং রাত পর্যন্ত দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় নারীসহ অন্তত ৩০ জন রক্তাক্ত জখম হন; স্থানীয় বাসিন্দারা আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করিয়েছেন। এদিকে গ্রামে দীর্ঘ সময় ধরে এমন ভয়াবহ দাঙ্গা ও ব্যাপক সংঘর্ষের খবর পেয়ে মাধবপুর থানা পুলিশের একটি বিশাল দল অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে পৌঁছে রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। এ সময় দাঙ্গাবাজদের ছত্রভঙ্গ করতে ও আত্মরক্ষার্থে পুলিশ অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে ৩ রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস (টিয়ারশেল) এবং ৭ রাউন্ড শর্টগানের ফাঁকা গুলি ছোড়ে; পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযান ও দীর্ঘ ৩ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা আপ্রাণ প্রচেষ্টার পর রাত প্রায় ৯টার দিকে খরকি গ্রামের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।
মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) গোলাম মোস্তফা ঘটনার সত্যতা ও পুলিশের অ্যাকশনের বিষয়টি নিশ্চিত করে স্পষ্ট জানান, “মূলত পূর্বের টাকা-পয়সা সংক্রান্ত দেনা-পাওনার বিরোধের জের ধরে সালিশ চলাকালে ভিডিও করাকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটেছে এবং খবর পাওয়ামাত্রই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে টিয়ারশেল ও শর্টগানের গুলি ছুড়ে দাঙ্গাবাজদের তাড়িয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এনেছে; বর্তমানে ওই গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও শান্ত রয়েছে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সাথে জড়িত ও শান্ত গ্রামকে রণক্ষেত্রে পরিণত করা মূল অপরাধীদের সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আইনি প্রক্রিয়া বর্তমানে দ্রুততার সাথে চলমান রয়েছে।”
রাজীব দেব রায় রাজু/এআর
মন্তব্য করুন: