সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নৌকার অভাবে নিভছে শিক্ষার আলো

ঝুঁকির মুখে শিক্ষার্থীরা

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নৌকার অভাবে নিভছে শিক্ষার আলো

নিজস্ব প্রতিনিধি,সুনামগঞ্জ

১৭/০৬/২০২৬ ১৭:৪১:২৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

বুকের ভেতর একরাশ স্বপ্ন নিয়ে যে শিশুরা প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের দিগন্তজোড়া পানির থইথই স্রোত যেন সেই স্বপ্নকে গিলে খেতে চাইছে। বর্ষা এলেই এ অঞ্চলের অবুঝ শিশুদের জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। শুকনো মৌসুমে ধুলো উড়িয়ে হেঁটে যে পথে বিদ্যালয়ে যাওয়া যেত, বর্ষায় সেই চেনা পথগুলোই রূপ নেয় এক একটি মরণফাঁদে। তখন বিদ্যালয়ে যাওয়ার একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে নৌকা। কিন্তু এক টুকরো নৌকার অভাবে আজ চরম ঝুঁকিতে এ অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা; থমকে যাচ্ছে শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ।


চলতি বর্ষাতেও মধ্যনগর উপজেলার বীরসিংহপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা গেছে চিরচেনা সেই নিষ্ঠুর চিত্র। মাস খানেকেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যালয় চত্বর ও সংযোগ পথ পানির নিচে তলিয়ে আছে। চারদিকে অথৈ জল, কিন্তু কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পারাপারের জন্য সরকারি কোনো নৌকার ব্যবস্থা নেই। ফলে বর্ষার শুরু থেকেই বিঘ্নিত হচ্ছে পাঠদান, শূন্য হয়ে পড়ছে শ্রেণিকক্ষ, আশঙ্কাজনকহারে কমছে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি।


সন্তানের পড়ালেখার ভবিষ্যৎ আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের টানাপোড়েনে পিষ্ট হচ্ছেন অসহায় অভিভাবকেরা। বীরসিংহপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর বাবা শাহাবুল আলম বুকভরা আর্তনাদ নিয়ে বলেন—"নুন আনতে পান্তা ফুরায় আমাদের। খুব কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহ করি। সাতসকালে মাছ ধরতে হাওরে চলে যেতে হয়। প্রতিদিন বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া তো আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। পারাপারের কোনো নৌকা নেই, তাই বাচ্চারা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না। আর যেদিন যায়, পানিতে ভিজে ওভাবে যেতে দেখলে কলিজাটা দুরুদুরু করে কাঁপে। সবসময় একটা চরম দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।"


গ্রামের বাসিন্দা মো. শামিম আহমেদ ক্ষোভ ও আক্ষেপের সুরে বলেন, "বর্ষা এলেই আমাদের বাচ্চাদের জন্য স্কুলটা যেন এক দুর্গম দ্বীপ হয়ে দাঁড়ায়। একটা নিরাপদ সরকারি নৌকার ব্যবস্থা কী রাষ্ট্র করতে পারে না? সরকারি উদ্যোগে একটা নৌকা দিলে আমাদের সন্তানরা নিয়মিত আলো পেত, আমাদের বুক থেকেও ভয়ের পাথরটা নামত।"


বীরসিংহপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুর রহমান নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে প্রথম সিলেটকে জানান, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা অনেক ঝুঁকি নিয়ে ও অভিভাবকদের সহায়তায় যাতায়াত করছে। কিন্তু শিক্ষার্থী পারাপারের জন্য সরকারিভাবে কোনো নৌকা বা মাঝির বরাদ্দ নেই। বাধ্য হয়ে মাঝেমধ্যে শিক্ষক ও অভিভাবকেরা নিজেদের গাঁটের পয়সা খরচ করে কোনোমতে নৌকা ও মাঝির ব্যবস্থা করেন, যা একেবারেই অপর্যাপ্ত।


এ বিষয়ে মধ্যনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন প্রথম সিলেটকে বাস্তবতার ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেন, "উপজেলার ৮৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৪০টি বিদ্যালয়ই বর্ষাকালে পুরোপুরি নৌকানির্ভর হয়ে পড়ে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারিভাবে কোনো নৌকা বা মাঝি সরবরাহের বাজেট বা ব্যবস্থা নেই। তবে আমরা ইতোমধ্যেই এই নৌকানির্ভর বিদ্যালয়গুলোর একটি তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি।"


হাওরবাসীর এখন একটাই আকুতি—আশ্বাস নয়, অতি দ্রুত সরকারি উদ্যোগে নিরাপদ নৌকার ব্যবস্থা করে ফিরিয়ে দেওয়া হোক শিশুদের চঞ্চল শৈশব আর বিদ্যালয়ের আঙিনা।

লতিফুর রহমান রাজু / সজল আহমদ

মন্তব্য করুন: