ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বন্যার তথ্য বিনিময় অব্যাহত

রয়েছে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা

ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বন্যার তথ্য বিনিময় অব্যাহত

প্রথম ডেস্ক

২৩/০৬/২০২৬ ০১:১৭:৪৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান ঘনিষ্ঠ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে বন্যা-সংক্রান্ত তথ্য ও জলবিদ্যাগত উপাত্ত বিনিময় অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী নদী অববাহিকাগুলোতে পানি প্রবাহ, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং নদীর পানির স্তর সম্পর্কে রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশ বন্যা পূর্বাভাস, আগাম সতর্কীকরণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তুলতে কাজ করছে।


বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) রবিবার এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে যে, সাম্প্রতিক ভারী মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সিলেট, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বেশ কিছু নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।


এই প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট মহল উল্লেখ করেছে যে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে বন্যা ও নদীর পানি প্রবাহ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে আসছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি বৃদ্ধির পরিস্থিতিতে এই তথ্যসমূহ বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন, পূর্বাভাস প্রদান এবং আগাম প্রস্তুতি গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করে।


ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নদী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সহযোগিতার প্রধান প্ল্যাটফর্ম হলো যৌথ নদী কমিশন। এই কমিশনের আওতায় দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা, তথ্য আদান-প্রদান এবং পানি সম্পদ ব্যবহারে পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রেখে আসছে। এর অধীনে ভারত গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, গোমতী, মনু, খোয়াইসহ বিভিন্ন অভিন্ন নদীর পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে সংগৃহীত তথ্য নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের কাছে প্রেরণ করে থাকে।


নদীর পানির উচ্চতা, প্রবাহের গতি, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং আবহাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কিত এই তথ্যগুলো বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব উপাত্তের ভিত্তিতে সম্ভাব্য বন্যার মাত্রা নিরূপণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণকে আগাম সতর্কবার্তা প্রদান করা সম্ভব হয়। ফলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং মানুষের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ সহজ হয়।


জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় চরম আবহাওয়া এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০২২ সালে ভারত ও বাংলাদেশ বন্যা-সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের সময়সীমা সম্প্রসারণে সম্মত হয়। আগে প্রতিবছর ১৫ মে থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত তথ্য বিনিময় করা হলেও বর্তমানে তা ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমের শেষভাগে কিংবা মৌসুম-পরবর্তী সময়ে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যও প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।


দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও গতিশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য বিনিময় ব্যবস্থাও চালু রয়েছে। ২০২৩ সালে ভারতের জলশক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে তাৎক্ষণিক বার্তা আদান-প্রদানের একটি ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে রিয়েল-টাইম তথ্য দ্রুত বিনিময় করা সম্ভব হচ্ছে, যা বন্যা পূর্বাভাস ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।


সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত অতিক্রমকারী নদীগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং বন্যা ঝুঁকি হ্রাসে তথ্য বিনিময় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের মাধ্যমে শুধু বন্যা পূর্বাভাসের মানই উন্নত হয় না, বরং স্থানীয় প্রশাসন, উদ্ধারকারী সংস্থা এবং সাধারণ জনগণও সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পায়।


এছাড়া ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম অঞ্চলের আবহাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কেও নিয়মিত তথ্য ও পূর্বাভাস প্রদান করে থাকে, যা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উজানের বৃষ্টিপাত এবং সম্ভাব্য পানি প্রবাহ সম্পর্কে ধারণা পেতে সহায়তা করে। ফলে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত প্রস্তুতি গ্রহণ আরও সহজ হয়।


বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্যা-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় এবং নদী ব্যবস্থাপনায় চলমান সহযোগিতা শুধু দুই দেশের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

উত্তম কাব্য / সজল আহমদ

মন্তব্য করুন: