সুনামগঞ্জে ড্রাগিস্টদের সংবাদ সম্মেলন
অ্যান্টিবায়োটিক বিতর্কে পুলিশের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি
অ্যান্টিবায়োটিক ঔষধ নিয়ে সুনামগঞ্জ সদর থানার ফেসবুক পেইজে অবৈজ্ঞানিক ও মনগড়া তথ্য প্রচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ কেমিস্টস্ এন্ড ড্রাগিস্টস্ সমিতি (বিসিডিএ) সুনামগঞ্জ জেলা শাখা। আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বেলা ১২টায় শহরের শহীদ জগতজ্যোতি পাঠাগার মিলনায়তনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবাদ জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলন থেকে জনমনে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করতে অনতিবিলম্বে পুলিশের ওই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ কেমিস্টস্ এন্ড ড্রাগিস্টস্ সমিতির সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মো: আলতাফুর রহমান।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিগত ১৪ জুন ২০২৬ তারিখে সুনামগঞ্জ সদর থানার অফিশিয়াল ফেসবুক পেইজ এবং কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে ঔষধ সম্পর্কিত কিছু বিজ্ঞানবহির্ভূত বক্তব্য সমিতির গোচরীভূত হয়। স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ আবির হাসান এবং সুনামগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন শেখের দেওয়া ওইসব বক্তব্য সম্পূর্ণ মনগড়া ও অবৈজ্ঞানিক।
জানা যায়, অভিযোগকারী আবির হাসান স্থানীয় ‘সেবা মেডিসিন পয়েন্ট’ থেকে ৫টি অ্যান্টিবায়োটিক ট্যাবলেট কেনেন। প্রথম দিন একটি ট্যাবলেট সেবনের পর তার জ্বর ও কাঁপুনি বেড়ে যায়। দ্বিতীয় দিন ঔষধের পাতা থেকে আরেকটি ট্যাবলেট বের করতে গিয়ে সেটি বিবর্ণ ও কালো দাগযুক্ত দেখতে পান তিনি। এরপর তিনি প্রতিকার চেয়ে সুনামগঞ্জ সদর থানায় যান।
সমিতির নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, ঘটনার দিনই সুনামগঞ্জ সদর থানা তাদের ফেসবুক পেইজে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে প্রথম ট্যাবলেটটি সেবনের কারণেই রোগীর জ্বর ও কাঁপুনি বেড়েছে বলে দাবি করা হয়, যা ওসির মুখেও শোনা যায়। পরবর্তীতে এই অভিযোগের ভিত্তিতে একটি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। মোবাইল কোর্টের বিজ্ঞ বিচারক এবং সুনামগঞ্জের ঔষধ তত্ত্বাবধায়কের উপস্থিতিতে ‘সেবা মেডিসিন পয়েন্ট’-এ থাকা ওই পাতার অবশিষ্ট ৩টি ট্যাবলেট সম্পূর্ণ সঠিক ও যথাযথ অবস্থায় পাওয়া যায়।
বিসিডিএ জেলা সভাপতি মো: আলতাফুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মোবাইল কোর্ট শেষ হওয়ার পর বিজ্ঞ বিচারক কিংবা ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক সংবাদ মাধ্যমকে প্রকৃত সত্য জানাননি। প্রশাসন কোনো তথ্য জনসমক্ষে পেশ না করায়, প্রথম ভিডিওতে ঔষধ খেয়ে জ্বর-কাঁপুনি বেড়ে যাওয়ার যে অবৈজ্ঞানিক দাবি করা হয়েছিল, তা জনমনে সত্য হিসেবেই রয়ে গেছে। এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করতে অ্যান্টিবায়োটিক ও ট্যাবলেটের বিবর্ণতার বিষয়ে স্পষ্ট ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে বলেন, ১টি মাত্র অ্যান্টিবায়োটিক ট্যাবলেট কোনো রোগের সম্পূর্ণ চিকিৎসা নয়। নির্দিষ্ট রোগের জন্য নির্ধারিত পরিমাণে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়কাল (কোর্স) পর্যন্ত এটি সেবন করতে হয়। অ্যান্টিবায়োটিক সরাসরি জ্বর বা ব্যথা উপশম করে না। জ্বর ও কাঁপুনি কমাতে হলে এর সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল বা সমজাতীয় ঔষধ গ্রহণ করতে হয়। আধুনিক বিশ্বমানের ঔষধ শিল্পেও উৎপাদনের ত্রুটির হার শতকরা ০.১ থেকে ১ ভাগ হতে পারে। মূলত 'মাইক্রোলিকেজ' (Micro Leakage) বা প্যাকেটের অতি সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে বাতাস ও আর্দ্রতা প্রবেশের কারণে ট্যাবলেট বিবর্ণ বা কালো দাগযুক্ত হতে পারে। এমনকি কোনো ক্রেতা ঔষধটি প্যান্টের পকেটে বা অসতর্কভাবে বহন করলেও পাতায় এমন মাইক্রোলিকেজ সৃষ্টি হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এ ধরনের ত্রুটিযুক্ত ঔষধ উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো ফেরত নিতে আইনত বাধ্য। কেমিস্টস্ এন্ড ড্রাগিস্টস্ সমিতির সকল সদস্য ক্রেতা সাধারণের সুবিধার্থে এই ধরনের যেকোনো ত্রুটিযুক্ত ঔষধ বদলে দিতে সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ।
পরিশেষে, রাষ্ট্রের একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান থেকে এমন অবৈজ্ঞানিক ও বিভ্রান্তিকর ধারণা প্রচার না করার অনুরোধ জানানো হয়। নেতৃবৃন্দ বলেন, এ ধরনের মনগড়া প্রচারণার ফলে সাধারণ রোগী এবং ঔষধ উৎপাদন ও বিপণনকারীদের মধ্যে অযাচিত দূরত্ব ও বিভেদ তৈরি হবে, যা দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য মোটেও শুভ নয়।
সংবাদ সম্মেলনে সুনামগঞ্জ জেলা ড্রাগিস্ট সমিতির অন্যান্য নেতৃবৃন্দসহ স্থানীয় প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
সজল আহমেদ
মন্তব্য করুন: