মুক্তাদিরের কমিটিতে ব্রাত্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী!

মুক্তাদিরের কমিটিতে ব্রাত্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী!

নীরব চাকলাদার

২৬/০৬/২০২৬ ২২:১৭:৩১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেটের আধ্যাত্মিক রাজনীতির হাওয়া বদলাতে সময় লাগে না, তবে তা যে এত দ্রুত ‘তড়িঘড়ি’ রূপ নেবে, তা হয়তো খোদ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও ভাবেননি। হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের তালা ভাঙা আর টাকার পাহাড় উদ্ধার নিয়ে যখন পুরো সিলেট তোলপাড়, ঠিক তখনই গঠিত হলো মাজারের আয়-ব্যয় দেখভালের ১২ সদস্যের ‘উচ্চপর্যায়ের’ কমিটি। কিন্তু সেই উচ্চপর্যায়ের তালিকায় সিলেটের সাবেক ‘সফল’ মেয়র ও বর্তমান হেভিওয়েট মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর স্থান হলো না। রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, মাজারের দানবাক্সে স্বচ্ছতা আসুক আর না আসুক, সিলেটের রাজনৈতিক অলিন্দে যে নতুন করে ‘ধোঁয়া’ বেরোতে শুরু করেছে, তা নিশ্চিত।


সবচেয়ে রসাত্মক ব্যাপারটি ঘটেছে ঠিক দুদিন আগে। গত বুধবার মালয়েশিয়া সফর শেষে সিলেটে পা রেখেই প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের সামনে বেশ চওড়া হাসিতে আশ্বস্ত করেছিলেন—মাজারের স্বচ্ছতা নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে তাঁর ‘কথা’ হয়েছে এবং সব এমপি-জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে দ্রুতই একটি সর্বদলীয় বৈঠক হবে। আরিফ যখন ‘সবাইকে নিয়ে বসার’ ছক কষছিলেন, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির হয়তো তখন মনে মনে হাসছিলেন। আরিফের সেই মন্তব্যের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পার হতে না হতেই, আজ শুক্রবার সকালে সার্কিট হাউজে এক ‘তড়িঘড়ি’ রুদ্ধদ্বার বৈঠক ডেকে ১২ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে দিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। আর সেই তালিকা থেকে খুব নিখুঁতভাবে ‘ভ্যানিশ’ করে দেওয়া হলো খোদ আরিফুল হক চৌধুরীর নাম!


বাণিজ্যমন্ত্রীর এই ‘পাসিং শট’ নিয়ে সিলেটের রাজনৈতিক আকাশে এখন মেঘ-রোদ্দুরের খেলা। মুক্তাদিরের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে সিসিক প্রশাসক, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার থেকে শুরু করে মাজারের মোতোয়াল্লি—সবাই ঠাঁই পেলেন, কেবল বাদ পড়লেন দুইবারের সাবেক পপুলার মেয়র আরিফ।


এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী মুক্তাদির সাহেব বেশ ঠান্ডা মাথার খেলোয়াড়। আরিফকে বাদ দেওয়া এবং বিদায়ী ডিসি সারওয়ার আলমের আকস্মিক বদলি নিয়ে সাংবাদিকদের বাউন্সার মার্কা প্রশ্নের জবাবে তিনি অত্যন্ত দার্শনিকসুলভ এক উত্তর দিলেন। বললেন, "আমরা পেছনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না... কাজ করার দুটি পদ্ধতি আছে—একটি হলো শুধু কাজ করা, অন্যটি হলো সবাইকে নিয়ে কাজ করা। আমরা সেরকম উদ্যোগই নিয়েছি।" তবে ‘সবাইকে নিয়ে’ কাজ করার এই ফর্মুলায় কেন একজন রানিং ফুল-মন্ত্রী বাদ পড়লেন, সেই অন্তর্দ্বন্দ্বের উত্তর অবশ্য বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছেন।


উল্লেখ্য, এই মাজার-নাটকের শুরু গত ১২ জুন, যখন তৎকালীন ডিসি সারওয়ার আলম মাজারের ঐতিহ্যবাহী ৩টি ডেক ও দানবাক্স সিলগালা করে দেন। এরপরই দেশ-বিদেশের ৬৭ জন বিশিষ্ট নাগরিকের প্রতিবাদের মুখে গত রবিবার ডিসি সাহেবকে ‘উইথড্র’ করা হয়। কিন্তু নাটক সেখানেই শেষ নয়; সোমবার সিলগালা করা বাক্স খুলতেই বেরিয়ে আসে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা, যার সিংহভাগই ছিল ৫০০ ও ১০০০ টাকার কড়কড়ে নোট। মাজারের বাক্সে এত বড় নোটের ‘উৎস’ কী, তা নিয়ে যখন আমজনতা রহস্য খুঁজছে, তখন সরকার বাহাদুর ব্যস্ত হলেন কমিটি গঠনে।


আপাতত নবগঠিত এই ১২ সদস্যের কমিটিকে আগামী এক মাসের মধ্যে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি ‘যৌক্তিক পদ্ধতি’ নির্ধারণ করার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আরিফুল হক চৌধুরীর মতো হেভিওয়েটকে ‘আউট অব বাউন্ডস’ রেখে এই কমিটি মাজারের ভেতরের এবং সিলেটের রাজনীতির বাইরের ‘স্বচ্ছতা’ কতটা বজায় রাখতে পারে!

সজল আহমদ/ তানজুবা তাবাসসুম

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad