উত্তাল ভারতের রাজনীতি
রাম মন্দিরে 'লুটের' টাকা বিজেপি-আরএসএসের কোষাগারে
ভারতের অযোধ্যায় নবনির্মিত রাম মন্দিরের অর্থ চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তাল হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উত্তর প্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকার এই চুরির তদন্তভার শেষ পর্যন্ত সিবিআই বা ইডির (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট) মতো কোনো কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার তীব্র চিন্তাভাবনা করছে।
বুধবার (১ জুলাই) রাজ্য সরকারের তৈরি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন পেশ করেছে। তদন্তের স্বার্থে সরকার এসআইটির মেয়াদ আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত বাড়িয়ে দিলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চুরির পরিধি এতই ব্যাপক যে নির্ধারিত সময়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া অসম্ভব। দিন দিন চুরির নতুন নতুন তথ্য ও নাম উঠে আসছে, যার ফলে আত্মসাৎকৃত অর্থের পরিমাণ ২০০ কোটি রুপি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সন্দেহ করা হচ্ছে, কেবল দানপাত্র নয়, মন্দিরের অন্যান্য সামগ্রীও হাতবদল হয়েছে এবং চুরির পরিধি রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।
এদিকে অযোধ্যা বার অ্যাসোসিয়েশন এক প্রস্তাবের মাধ্যমে স্বচ্ছ তদন্তের স্বার্থে মামলাটি সিবিআইয়ের হাতে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। একই সাথে অ্যাসোসিয়েশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অভিযুক্তদের পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে দাঁড়াবেন না; এই নিয়ম ভাঙলে ৫ লাখ রুপি জরিমানা করা হবে। অন্যদিকে, এই চুরি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলাও শুনানির জন্য গৃহীত হয়েছে।
রাম মন্দিরের এই চুরির ঘটনা এখন আর কেবল ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আগামী বছরের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিরোধীরা একে ‘সুপরিকল্পিত লুট’ হিসেবে প্রচার শুরু করেছে। কংগ্রেস নেতা পবন খেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, "বিজেপি ও আরএসএস মাহমুদ গজনির রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ইতিহাসে লেখা আছে, মাহমুদ গজনি ২৭ বছরে ভারতের ১৭টি মন্দির লুট করেছিল। আর বিজেপি-আরএসএস মাত্র ৪৩ দিনে ৭০ বার ভগবান রামকে লুট করেছে।"
গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ৩৯ দিনে মন্দিরে ৭০ বার চুরি হয়েছে। অযোধ্যা পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মহাকুম্ভ মেলার সময় সবচেয়ে বেশি চুরি হয় এবং চুরির মূল হোতা হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া লবকুশ মিশ্র ও অনুকল্প মিশ্র হলেন মন্দির ট্রাস্টের সদস্য অনিল মিশ্রর আত্মীয়। এসআইটির তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মন্দির উদ্বোধনের পর ২ হাজার কোটি রুপির বেশি দান পাওয়া গেলেও হিসাবের মধ্যে বিপুল গরমিল রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোর প্রচার চলছে যে, এই বিপুল অর্থ আরএসএস ও বিজেপির কোষাগারে জমা হয়েছে। আরএসএস দীর্ঘ ১০০ বছর ধরে কোনো নিবন্ধিত সংস্থা না হওয়ায় তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করতে হয় না। সম্প্রতি কর্ণাটকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরএসএসকে নিবন্ধিত হওয়ার নির্দেশ দিলে এই বিতর্ক আরও উসকে যায়।
লুটের এই খবর জানাজানি হওয়ার পর অযোধ্যায় রাম ভক্তদের আনাগোনা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় হোটেল ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। মন্দিরে দানসামগ্রী আসার পরিমাণও প্রায় ৭২ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম জিটিভি। অথচ ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (আইআইএম) এবং পিআইবি-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে যেখানে অযোধ্যায় বার্ষিক পর্যটক ছিল মাত্র ১৬ লাখ, ২০২৪ সালে মন্দির উদ্বোধনের পর তা বেড়ে ১৬ কোটিতে উন্নীত হয়েছিল।
ভোটের আগে এই চুরির ঘটনা এবং তদন্তের গাফিলতি যাতে রাজ্য সরকারের ওপর না বর্তায়, সেজন্যই যোগী সরকার দ্রুত কেন্দ্রের হাতে তদন্তভার ছেড়ে দিয়ে বিড়ম্বনা থেকে বাঁচতে চাইছে।
তাহির আহমদ/ মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: