সুনামগঞ্জের হাওড়ে ঢেউয়ের তাণ্ডব,বাসিন্দাদের ভিটে রক্ষায় লড়াই
দূর থেকে গ্রামগুলোকে দেখলে ছোট ছোট দ্বীপের মতো মনে হয়। সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাহাদুরপুরও তেমন একটি গ্রাম। এর পশ্চিমে আঙ্গারুলি হাওড়, পূর্বে রূপসা নদী ও খরচার হাওড়। উপজেলা সদর থেকে নৌকায় সেখানে যেতে মিনিট বিশেক সময় লাগে। হাওড়ের অন্য গ্রামের মতো এখানেও বছরের ছয় মাস জলবন্দি জীবন কাটে মানুষের।
উত্তর-দক্ষিণে লম্বাকৃতির এই গ্রামের ছোট ছোট ঘরগুলোর কোনোটি টিনের, কোনোটির চালা টিনের হলেও বেড়া খড়ের। ঘরগুলো দেখেই এখানকার বাসিন্দাদের আর্থিক অবস্থা বোঝা যায়।
জেলে-কৃষক পরিবার, প্রতিটি বসতভিটার সামনে-পেছনে বাঁশের আড় দিয়ে বাঁধা। আড়ের ভেতরে মাটিভর্তি বস্তা অথবা কচুরিপানা দেওয়া থাকে। হাওড়ের ঢেউয়ের তাণ্ডব থেকে ঘরবাড়ি, বসতভিটা রক্ষা করতেই এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এখানকার গ্রামগুলোতে যুগ যুগ ধরেই মানুষ নিজেদের বসতভিটা রক্ষায় প্রতি বছর আড় তৈরির এই কাজ করেন। টাকাপয়সা না থাকলে ঋণ করে হলেও এটি করেন তারা। কোনো কোনো বছর বন্যা একাধিকবার হলে বসতভিটা রক্ষার এই কাজও একাধিকবার করতে হয়।
স্থানীয় কৃষক হিমাংশু বর্মণের (৪২) ঘরটি হাওড়ের পাড়েই। বসতভিটা রক্ষায় বাঁশের আড়ের ভেতর কচুরিপানা স্তূপাকারে দিচ্ছিলেন তিনি। পানিতে নেমে ঢেউয়ের ধাক্কায় টিকে থাকতে পারছিলেন না। হিমাংশু বর্মণের সঙ্গে কথা বলার সময় গ্রামের আরও কিছু মানুষ জড়ো হন সেখানে। নিজেদের কষ্ট ও দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন তারা। বাহাদুরপুর গ্রামটি দুই হাওড়ের মাঝামাঝি জায়গায় থাকায় বিপদ আরও বেশি।
ইতোমধ্যে ঢেউয়ের তোড়ে ১৫ থেকে ২০টি ঘরবাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকের ঘরের অর্ধেকটা ভেঙে চলে গেছে হাওড়ে। বাকিটুকু রক্ষায় বাঁশের আড় দেওয়া হয়েছে। যাদের সামর্থ্য নেই তারা নিরুপায় হয়ে বসে আছেন। কেউ কেউ ঘরবাড়ি হারিয়ে চলে গেছেন গ্রাম ছেড়ে।
হিমাংশু বর্মণ বলছিলেন, ‘গ্রামের মানুষ গরিব। অবস্থা তো ভালা না। আমার নিজের ১০ হাজার টাকা লাগছে প্রথমে কাজ (বসতভিটা রক্ষা) করতে। আবার কাজ করত অইব। কিন্তু টাকা তো নাই। সবার একই অবস্থা।’
উপজেলার সদর বাজার থেকে নৌকায় করে রূপসা নদী হয়ে বাহাদুরপুর গ্রামে যেতে হয়। রাধানগর গ্রামটি পার হলেই শুরু খরচার হাওড়। এখন পানিতে হাওড় ও নদী মিলেমিশে একাকার।
জানা গেছে, গ্রামে ১১০টি পরিবার আছে। লোকজন শুষ্ক মৌসুমে কৃষি শ্রমিকের কাজ করেন। আর বর্ষায় হাওড়ে মাছ ধরে জীবন চালাতে হয়। এখন নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোনো উপায় নেই। শুধু খরচার হাওড় নয়, সুনামগঞ্জের সব হাওড় এবং হাওড়পাড়ের মানুষের জীবনচিত্র প্রায় একই রকম। মানুষের জীবন হাওড়ের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষায় তাদের তেমন কোনো কাজ নেই। মাছ ধরা, কৃষিকাজ ছাড়া কোনো বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। হাওড়ে সম্পদ কমায় জীবনযাপন এখানে দিন দিন কঠিন হচ্ছে।
গ্রামের মাঝামাঝি গিয়ে দেখা যায়, একটি ভাঙাচোরা ঘরের সামনের অংশে ছোট একটি দোকান। ঘরের পেছনে একটি ছাপরা ছিল, যেখানে রান্না ও পাশে দুটি গরু রাখা হতো। সেটি হাওড়ের ঢেউয়ে ধসে পড়েছে। এখন ঝুঁকিতে আছে পুরো ঘরটি। ঘরের মালিক অর্জুন বর্মণ (৪০) স্ত্রী সোনালী বর্মণকে (৩৫) নিয়ে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বেড়ার কাজ করছিলেন। অর্জুন বর্মণ বলেন, রাতে ভয় হয়। ঢেউ ওঠে বেশি। তাই ছেলে আর ঘরে থাকে না। সে প্রতিবেশী একজনের ঘরে গিয়ে ঘুমায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা পাশের একটি খালি জায়গায় মাটিতে মিশে থাকা পুরোনো টিন, বাঁশ, কাঠ দেখিয়ে জানালেন, এটি শিপু বর্মণের ঘর। ঢেউয়ের তাণ্ডবে ভেঙে গেছে। তাই পরিবার নিয়ে তিনি এলাকা ছেড়ে ঢাকায় চলে গেছেন।
প্রীতম দাস/ ডিডি
মন্তব্য করুন: