রংপুরে চার খুনের ঘটনায় পুলিশের ‘ইউটার্ন’

রংপুরে চার খুনের ঘটনায় পুলিশের ‘ইউটার্ন’

প্রথম ডেস্ক

২৭/০৮/২০২৬ ১৪:৩২:২১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

রংপুর মহানগরীতে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে খুনের ঘটনার সময় নিয়ে ‘ইউটার্ন’ নিয়েছে পুলিশ। নতুন করে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, খুনের ঘটনা ঘটেছে সকালবেলা। এর আগে পুলিশ জানিয়েছিল, খুনের ঘটনা ঘটে দিবাগত রাতে। একই ঘটনা নিয়ে দুই ধরনের তথ্য উপস্থাপন করায় তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


চার খুনের ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি জানাতে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টায় সংবাদ সম্মেলন করে রংপুর মহানগর পুলিশ। নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরেন।


গত শনিবার (২৩ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাসা থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীর মরদেহ করে পুলিশ।


চারজনকে খুনের ঘটনায় পর দিন রোববার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামে দুজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায় পুলিশ। তখন পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, বৃহস্পতিবার রাতে হত্যার ঘটনা ঘটে। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। তারা সম্পর্কে মামাতো ভাই।


পুলিশ আরও জানিয়েছিল, গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ছাদে ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে খালি গায়ে গলায় গামছাসহ ছাদে ওঠেন গণপতি চক্রবর্তী। ওই গামছা দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। শব্দ পেয়ে সিঁড়িয়ে বেয়ে উপরে উঠতে যান তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী। তখন তাকে সিঁড়িতেই হত্যা করে ওই দুজন। ওই দম্পতির অনার্স পড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রাপ্তি ঘর থেকে বেরিয়ে এলে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে তারা। ওই দম্পতির ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী পিয়ম যেন তাদের পরিচয় প্রকাশ না করে দেয়, সে জন্য তাকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ।


গত সেমবার মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানার কাছ থেকে পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) শাখায় হস্তান্তর করা হয়। অধিকতর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়ার লক্ষ্যে তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।


মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের বন্ধু সীমান্ত দাস মঙ্গলবার রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।


তদন্তের অগ্রগতি জানাতে বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, হত্যার দিন ৯টি ইয়াবা সেবন করেছিল খুনিরা। তারা এর আগে এত বেশি ইয়াবা সেবন করেনি। এর আগে সর্বোচ্চ দুইটা ইয়াবা সেবন করেছিল। প্রথমে রাত তিনটা পর্যন্ত সীমান্তের বাড়িতে তারা ইয়াবা সেবন করেছিল। এরপর গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের দেবুর ভবনের ছাদ দিয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতির বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা পানির ট্যাংকির আড়ালে মাদক সেবন করছিলেন। ইয়াবা সেবন করতে করতে ভোরের আলো ফুটে ওঠে।


পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি সকালে ছাদে হাটতে এসে তাদের দেখে ফেলেন। জোরে জোরে ধমক দেন–‘তোরা এখানে কি করিছ’। তখন তাদের মাথা কাজ করছিলে না। তারা মান-সম্মানের ভয়ে গণপতির সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে ধরে শ্বাসরোধ করে। গণপতিকে হত্যার পরে পালিয়ে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী ও মেয়ে চিৎকার শুরু করে। চিৎকার করা দেখে মুগ্ধের হাতে থাকা গণপতির গামছা দিয়ে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতার গলা চেপে ধরা হয়।


তিনি আরও বলেন, সিদ্ধার্থ এক হাতে গণপতির মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর গলা চিপে ধরে। আরেক হাতে বুক চেপে ধরে। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য পাশের কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি এনে গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দিয়ে হত্যা করে। বাড়িতে কোনো সিসি ক্যামেরা আছে কি না, এই ভয়ে সিদ্ধার্থ নিচে গিয়ে প্লাস নিয়ে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয়। তখন মুগ্ধ ছাদের উপরে ছিল। সিদ্ধার্থ আবার ছাদে গিয়ে মুগ্ধসহ মা-মেয়ের লাশ সিঁড়ির মধ্যে রেখে দেয়। পাশের ছাদ থেকে যেন দেখা না যায়।


মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, তিনজনকে হত্যার পরে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতির রুমে ঢুকলে তখন বাচ্চাটা (আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম) জেগে উঠে। বাচ্চাটা সিদ্ধার্থকে দেখে বলে–‘দাদা তুমি এখানে কেন?’ তখন দুইজনে বাচ্চাটাকে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপর তারা বাথরুমে ঢুকে গোসল করে। সেখানে অবশিষ্ট আরেকটি ইয়াবা সেবন করে। মুগ্ধের মাথায় আসে যেহেতু তারা মেরে ফেলছে এটা যেন চুরি বা ডাকাতি হিসেবে মানুষ মনে করে। তখন তারা ড্রয়ার এলোমেল করতেছিল। মুগ্ধ অলংকার এনে দিচ্ছিল সিদ্ধার্থ সেগুলো প্লাস্টিকের বাক্সে এবং কাপড়ের ব্যাগে ঢুকাচ্ছিল। এরপর সেই বাড়িতে তারা ১৫ হাজার টাকা পায়। জুমার নামাজের সময় গণপতির বাসার ছাদ হয়ে দেবুদের বাসার ছাদ দিয়ে সাবধানে দেয়াল টপকে বেরিয়ে যায়।


পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, মুগ্ধ ১৫ হাজার টাকা নিয়েছিল। স্বর্ণ সিদ্ধার্থ নিয়ে রাস্তার পাশে রেখে কাউকে বুঝতে না দিয়ে ‘পূর্ণিমা কাকীর’ বাসার পেছনে মাটিতে পুতে রাখে। ‘পূর্ণিমা কাকী’ বা তার বাড়ির লোকজন এসব বিষয়ে কিছু জানত না। সিদ্ধার্থ বাসায় গিয়ে গোসল করে মুগ্ধের কাছে সাড়ে তিন হাজার টাকা নিয়ে তার বন্ধক রাখা মোবাইল উদ্ধার করে। পরদিন পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে আসে।


পুলিশের বক্তব্য নিয়ে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ বলেন, আসামিরা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে এখন কারাগারে রয়েছেন। আসামিদের জবানবন্দির পর পুলিশ বক্তব্য দিয়েছিল হত্যাকাণ্ড নিয়ে। পুলিশের আজকের বক্তব্যের সঙ্গে আগের বক্তব্যের বিস্তর অমিল রয়েছে।


তিনি আরও বলেন, এই সময়ের মধ্যে আসামিদের রিমান্ডে নেওয়া হয়নি। নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি। তাহলে পুলিশ নতুন তথ্য কোথায় পেল। শুরু থেকে পুলিশের বক্তব্য নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক, সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল। এখন সেটি আরও বেশি স্পষ্ট হচ্ছে।

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad