সিলেট-৪ আসন : ‘আসল’ প্রার্থী নিয়ে বিএনপিতে ধোয়াঁশা
সারাদেশের মতো সিলেটেও দলীয় মনোনয়নের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছে বিএনপি। এর মধ্যে সিলেটের ১৯ টি আসনের বিপরীতে ১৪ টি আসনে প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। বাকী ৫ টি আসন এখনও ফাঁকা রয়েছে। ফাঁকা আসনগুলোতে সুযোগ বোঝে নিজ দলের অথবা শরীকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হতে পারে-এমনটি ধারণা করছেন অনেকেই। তবে ৩ নভেম্বর প্রার্থীতা ঘোষণার পর সিলেটের বেশ কয়েকটি আসনে প্রার্থীতা পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ-৫,সুনামগঞ্জ-১,সিলেট-৬ আসন রয়েছে। কিন্তু সিলেট-৪ আসনের পরিস্থিতি আরেকটু ভিন্ন। ফাঁকা রাখা এই আসনটিতে দলের মনোনয়ন পেতে মরিয়া বেশ কয়েকজন দলীয় প্রার্থী। সিলেট-৪ আসনে কৌশলগত কারণে দলীয় প্রার্থীর নাম নাম প্রকাশ করেনি বিএনপি। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, মূল তালিকায় নাম না থাকলেও সিলেট-৪ আসনে নিজেকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে দাবি করে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন সিলেট সিটি কর্পোরেশেনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বি অপর প্রার্থীরা বলছেন, ‘এটি দলীয় ঘোষণা নয়, এই ঘোষণা ব্যক্তি আরিফুল হকের।’ এর পর থেকে আসনটি ঘিরে দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে শুরু হয়েছে বিভাজন। প্রশ্ন সবার- সিলেট-৪ আসনে আসল প্রার্থী কে ?
জানা গেছে সিলেটের ১৪টি আসনে তালিকা প্রকাশের পরদিন ৪ নভেম্বর ঢাকায় ছোটে যান বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্ঠা আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি সেখানে দলীয় মহাসচিবসহ দলীয় চেয়ারপার্সনের সাথেও সাক্ষাত করেন। আরিফুল হক দাবি করেন- চেয়ারপার্সনের আমন্ত্রণে তিনি ঢাকায় চলে যান এবং সেখানে দলীয় প্রধান সিলেট-৪ আসনে তাকে নির্বাচন করার জন্য মনোনয়ন প্রদান করেন। আরিফুল হকের এই ঘোষণার পর থেকে শুরু হয় তোলপাড়। দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী অপর প্রার্থীরা বিষয়টি বিভ্রান্তিকর ব্যখ্যা দিয়ে নিজেদের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রচারনা এখন অনেকটা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আরিফুল হকের বিষয়টিকে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে দলীয় অপর প্রার্থীরা প্রতিদিনই নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। বিশেষ করে গোয়াইনঘাট উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির উপদেষ্টা আবদুল হাকিম চৌধুরী এবং আরিফুল হক চৌধুরীর দ্বন্দ্ব এখন অনেকটা প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। প্রায় সপ্তাহব্যাপী ধরে সিলেট-৪ আসনে দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে এই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লেও,হাইকমান্ড এখনও আসনটিতে মনোনীত প্রার্থীর নাম প্রকাশ করে নি। দলের কেন্দ্রীয় এক নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে ‘প্রথম সিলেট ডট কম’কে জানান-দল সিলেট-৪ আসনের ব্যাপারে এখনও কাউকে চূড়ান্ত হিসেবে মনোনীত করে নি। তিনি আরিফুল হক চৌধুরীর দাবির ব্যাপারে বলেন, ‘সেটি আরিফুল হক চৌধুরীর বক্তব্য, দলের নয়’। ফলে আরিফুল হক চৌধুরীর দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলতে শুরু করেছেন ভোটাররা।
এদিকে গেল শনিবার গোয়াইনঘাট উপজেলা সদরে আট ঘণ্টার ব্যবধানে সিলেট-৪ (গোয়াইনঘাট–কোম্পানীগঞ্জ–জৈন্তাপুর) আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী দুই নেতার সমর্থনে কর্মসূচি পালিত হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই নেতার এসব কর্মসূচিকে স্থানীয় লোকজন ‘পাল্টাপাল্টি শোডাউন’ হিসেবে মনে করছেন। ওইদিন উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সিলেট সিটি করপোরেশনের দুবারের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী মতবিনিময় সভা করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে উপজেলা সদরে মিছিল ও সমাবেশ করেছেন গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের দুবারের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরীর সমর্থকেরা।
স্থানীয় বিএনপি সূত্রে জানা যায়, সিলেট-১ আসনে মনোনয়নবঞ্চিত হন আরিফুল হক চৌধুরী। এ অবস্থায় তাঁকে দলের উচ্চপর্যায় থেকে ঢাকায় জরুরি তলব করা হয়। পরে ৫ নভেম্বর দলের চেয়ারপারসনের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, দলের চেয়ারপারসন তাঁকে সিলেট-৪ আসনে নির্বাচন করার নির্দেশ দিয়েছেন। শিগগির এ-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হবে।
আরিফুল হকের এমন ঘোষণার পর ‘স্থানীয় প্রার্থী’ হিসেবে আসনটিতে জেলা বিএনপির উপদেষ্টা আবদুল হাকিম চৌধুরীকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে টানা কর্মসূচি পালন করছেন তাঁর কর্মী–সমর্থকেরা। একই দাবিতে সভা–সমাবেশ করছেন জেলা বিএনপির আরেক উপদেষ্টা হেলাল উদ্দিন আহমদের অনুসারীরাও।
গোয়াইনঘাটের সভায় আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমি বিএনপির সঙ্গে প্রায় ৪৭ বছর ধরে আছি। কোনো দিন বিএনপির সিদ্ধান্তের বাইরে যাইনি। দলের সিদ্ধান্তে আমি আপনাদের খেদমতে এসেছি। কারণ, বিগত ১৭ বছর যে উন্নয়ন হওয়ার কথা, এর ছিটেফোঁটাও গোয়াইনঘাটে লাগেনি। খনিজ সম্পদে ভরপুর এ এলাকার মানুষ উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত। নির্বাচিত হলে এক বছরের মধ্যে এই এলাকার চিত্র বদলে যাবে।’
এদিকে আবদুল হাকিম চৌধুরী বলেন, ‘সিলেট-৪ আসনে জামায়াত শক্তিশালী প্রার্থী দিয়েছে। তিনি জৈন্তাপুর উপজেলার বাসিন্দা। তাঁর বিপরীতে জয় পেতে হলে বিএনপিকে একজন “স্থানীয় ও শক্তিশালী” প্রার্থী দেওয়া উচিত। যেহেতু আমি গোয়াইনঘাট উপজেলার বাসিন্দা, তাই স্থানীয়রা আমাকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার দাবিতে সভা, সমাবেশ, মিছিল করছেন। তবে দল যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেটাই চূড়ান্ত।’
স্থানীয় বিএনপির সূত্রে জানা গেছে, আরিফুল, হাকিম ও হেলাল ছাড়াও সিলেট-৪ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, সাবেক সংসদ সদস্য দিলদার হোসেন সেলিমের স্ত্রী জেবুন্নাহার সেলিম, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, কেন্দ্রীয় বিএনপির সাবেক সহস্বেচ্ছাসেবক-বিষয়ক সম্পাদক সামসুজ্জামান মনোনয়নপ্রত্যাশী। এখানে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করছেন দলটির জেলা কমিটির সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: