শ্রীমঙ্গলে ১১ মাস ধরে ঘরবন্দী এক পরিবার
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের আঐ গ্রামে প্রায় এক বছর ধরে যেন থেমে আছে একটি বাড়ি। বাড়ির ভেতরে চারজন মানুষ, কিন্তু বাইরের পৃথিবীতে যাওয়ার কোনো পথ নেই। চলাচলের একমাত্র রাস্তাটি টিনের বেড়া আর গাছের ডাল দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে শিক্ষক আব্দুর রহিমের পরিবার এমনই বন্দিদশায় দিন কাটাচ্ছেন।
৭০ বছর বয়সী আব্দুর রহিম। সারাজীবন গ্রামের লছনা উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে কাটিয়েছেন। অবসর নিয়ে কিছুদিন গাজীপুরে চাকরি করে কাটালেও, এই গ্রামই তাঁর নিজের। কিন্তু সেই গ্রামের মাটিতেই এখন তাঁর পরিবার বন্দির মতো বসবাস করছে।
এভাবেই নিজের অসহায়তার কথা জানান আব্দুর রহিমের ছেলে নূরুল আফসার সাইফুল। গত বৃহস্পতিবার তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “আমরা বাড়িতে বন্দি। কারও দোরগোড়া ধরে অন্যের উঠান দিয়ে বের হতে হয়। এটা একটা পরিবারের জন্য কতটা লজ্জা আর কষ্টের, বুঝানো কঠিন।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই পথ দিয়ে গ্রামের মানুষ ছোটবেলা থেকেই চলাচল করে এসেছে। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে গত জানুয়ারিতে ভাতিজা আজাদ মিয়া টিনের বেড়া ও বড়ইগাছের ডাল–পাতা দিয়ে রাস্তাটি বন্ধ করে দেন। এর পর থেকেই আব্দুর রহিমের পরিবারের যাওয়া–আসা প্রায় বন্ধ।
প্রতিবেশী দুলাল মিয়া বলেন,“এই রাস্তা ছিল সবাইর জন্য। শত্রুতার কারণে হঠাৎ করে বন্ধ করে দিল। এতে পরিবারটা খুব কষ্টে আছে।”
আজাদ মিয়ার দাবি ভিন্ন—“জমি নিয়ে বিরোধ চলমান। আগেই সমাধান হোক, তারপর পথ খোলা যাবে।”
আঐ গ্রামের সাধারণ মানুষ এই পরিবারের কষ্টটা দেখছেন, কিন্তু সমাধানের শক্তি সবার নেই। দূরে কোথাও বিয়ের গান বাজে, গ্রামের উৎসবে শিশুদের হাসি শোনা যায়—কিন্তু আব্দুর রহিমের বাড়িতে সেই শব্দের প্রতিধ্বনি নেই। একজন শিক্ষক, যিনি সারা জীবন শিক্ষার্থীদের চলার পথ দেখিয়েছেন—আজ নিজ বাড়ির পথই হারিয়েছেন।
ইউপি সদস্য মাহমুদ আলী বলেন,“লাঠি মেরে রাস্তা খুলতে পারব না”। তিনি রাস্তাটি খোলার জন্য বহুবার অনুরোধ করেছেন কিন্তু ফল হয়নি। “আইনের বাইরে গিয়ে কাউকে বাধ্য করা যায় না।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসলাম উদ্দিন বলেন, “অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”
সমস্যাটি শুধু জমি–বিরোধ নয়—একটি পরিবারের বেঁচে থাকার ন্যূনতম স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্ন। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পথটি আবার খুললে বাড়িটির জানালা দিয়ে আলো ঢুকবে—ফিরে আসবে স্বাভাবিক জীবন।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: