সিলেটে জাতীয় পতাকা বিক্রি কমে গেছে, হতাশায় বিক্রেতারা
‘অহনে কেউ আরা পতাকা কিনতে চায় না’
সিলেট মহানগরের বন্দরবাজারে জাতীয় পতাকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন সোহরাব হোসেন (৩৮)। বিজয় দিবসের সময়কে কেন্দ্র করে তিনি কয়েকদিন আগেই অপেক্ষায় থাকতেন, শহরের পথ–পান্থালী, দোকান-মোটরসাইকেল, রিক্সার চালক—সবার কাছ থেকে পতাকা বিক্রি করে কষ্টে হলেও সংসার চালাতেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আলাদা।
সোহরাব বললেন, “আগে বিজয় দিবস আইলেই পয়লা দিন থাইক্কাই বিক্রি শুরু হতো। শহরের মোটরসাইকেলের ছেলে-মেয়েরা কিনতো, দোকানীরা কিনতো, রিক্সার চালকরা কিনতো। তখন একদিনে হাজার টাকা, কখনো এক হাজার পাঁচশতও বিক্রি হতো। কিন্তু দুই বছর ধরে আগের মতো বিক্রি হয় না। অহনে দুইশো ট্যাকাও হয় না।”
ময়মনসিংহ থেকে সিলেটে আসা এই বিক্রেতা জানান, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কঠিন। মানুষ এখন প্রতিটি টাকার হিসাব রাখছে। “আগের মতো উৎসাহ নেই, লোকজন মনে হয় ভাবছে, পতাকা কেনা এখন কোনো দরকারি জিনিস নয়। দিনের শেষে যা রোজগার হয়, তা শুধু খোরাকির জন্য যথেষ্ট, কিন্তু ব্যবসা বা ভবিষ্যতের জন্য কিছুই নয়,” তিনি যোগ করেন।
সোহরাবের মতো আরও অনেকে আছেন যারা জাতীয় দিবসের আগে পতাকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বছরের বাকি সময়ে তাঁরা কসমেটিকস বা অন্যান্য ছোটখাট ব্যবসা করে নিজেরা চালান। ডিসেম্বর মাস এলে দেশের বিভিন্ন স্থানে পতাকা বিক্রি করতে নামেন। তবে চলতি বছর সেই আশা পূরণ হয়নি।
মদিনা মার্কেট এলাকার বিক্রেতা আরমান আলী জানান, ৭ ডিসেম্বর থেকে সিলেটে আসার পর প্রতিদিন মাত্র ৪০০–৫০০ টাকার পতাকা বিক্রি হচ্ছে। “আমার কাছে ১০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা দামের পতাকা আছে। বিক্রি কম থাকায় অনেক সময় কিনা দামেই বিক্রি করতে হয়। দিন শেষে শুধু খোরাকের জন্য রোজগার হয়, ব্যবসার কোনো আনন্দ নেই।”
আরেক বিক্রেতা আলম মিয়া বলেন, দুই বছর আগেও স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীরা বিপুলসংখ্যক পতাকা ও মাথার ব্যাজ কিনত। এবার স্কুলে গিয়ে তেমন সাড়া নেই। তিনি মনে করছেন, দেশের মানুষ যেমন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে, তা সরাসরি তাঁদের ছোট ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলেছে। “আগের মতো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ পতাকা কিনছে না। হতাশা আছে, কিন্তু আমরা থেমে থাকি না। জীবিকার জন্য কিছু না কিছু বিক্রি করতে হবে,” তিনি যোগ করেন।
এই বিক্রেতাদের জন্য জাতীয় দিবসের মাস এখন শুধু ব্যবসা নয়, এক ধরণের আশা ও সংগ্রামের প্রতীক। পতাকা বিক্রি করতে গিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়—মানুষের উদাসীনতা, ক্রয়ক্ষমতার সংকট, আর দিনশেষে শুধু ‘খোরাকের’ টাকাই যা হাতে আসে।
সোহরাব হোসেনের কথায়, “আগের দিনে আমরা খুশি হতাম মানুষের আনন্দে, পতাকা বিক্রি করে মনে হত আমাদেরও দেশের জন্য কিছু করলাম। এখন সেই আনন্দ নেই, শুধু জীবন কাটানোর চেষ্টা।”
জাতীয় দিবসের পতাকা বিক্রেতাদের এই সংগ্রাম আজ দেশের এক নীরব ছবি, যেখানে উৎসব ও আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে হতাশা ও বাস্তবতার কঠিন ছাপ।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: