৫ গুণ বেশি বরাদ্দে ভাগাভাগির অভিযোগ
সুনামগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধে লুটপাটের মহোৎসব
সুনামগঞ্জের হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ভয়াবহ দুর্নীতি ও লুটপাটের চিত্র উঠে এসেছে। মাটির কাজে যেখানে প্রকৃত খরচ হওয়ার কথা ২ লাখ ৯ হাজার টাকা, সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা—যা প্রকৃত খরচের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সদস্য ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ভাগাভাগিই এখন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কৃষকদের দাবি, প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণের নামে সরকারি বরাদ্দের অপচয় করা হচ্ছে। ২০১৭ সালে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে পিআইসি গঠনের পর থেকে রাজনৈতিক প্রভাবে কমিটি গঠন এবং অপ্রয়োজনীয় বাঁধের সংখ্যা বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের নতুন নতুন কৌশল নেওয়া হয়েছে। পাউবোর টাস্কফোর্সের এক গোপন জরিপে দেখা গেছে, কোনো কোনো বাঁধে মাটির কাজের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে দোয়ারাবাজারের কালনার হাওর এবং জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরের পিআইসিগুলোতে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, পাউবোর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান ও সাবেক জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদের সময়কালেই এই লুটপাটের ভিত্তি মজবুত হয়। সবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে গত ৫ বছরে শতকোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জনের অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে, বাঁধের পরিকল্পনায় চরম ত্রুটির কারণে কৃষকের কপাল পুড়ছে। বাঁধগুলো কেবল পাহাড়ি ঢল ঠেকানোর কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হলেও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে বৈশাখের শুরুতে টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় হাজার হাজার একর জমির পাকা ও আধা-পাকা ধান তলিয়ে গেছে। পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় নিরুপায় হয়ে কৃষকরা জেলার ২৬টি স্থানে বাঁধ কেটে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
পাউবোর মহাপরিচালক মো. এনায়েত উল্লাহ পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আবহাওয়া বিশ্লেষণে ৩০ এপ্রিলের আগে এত বৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল না। অধিকাংশ জায়গায় নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় এই বিপর্যয় ঘটেছে। পাউবো সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. কাইসার আলম জানান, সুনামগঞ্জের ৫২টি হাওরের মধ্যে সচল রেগুলেটর মাত্র ৩২টি। জলাবদ্ধতা দূর করতে আরও ৬৭টি নতুন ড্রেনেজ স্ট্রাকচার নির্মাণ জরুরি। তবে কৃষকদের প্রশ্ন—সরকারের শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পে কেন স্থায়ী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখা হলো না? কর্মকর্তাদের ‘অভিজ্ঞতার পাঠশালা’ হয়ে ওঠা এই হাওরে দুর্নীতির লাগাম না টানলে প্রতি বছর এভাবেই কৃষকের স্বপ্ন পানির নিচে তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: