শীত বাড়লেই জমজমাট সুনামগঞ্জের ‘হাঁসভাত পয়েন্ট’
Led Bottom Ad

হাঁসের মাংসের গন্ধে পর্যটক-যাত্রীর মিলনমেলা

শীত বাড়লেই জমজমাট সুনামগঞ্জের ‘হাঁসভাত পয়েন্ট’

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

০৬/০১/২০২৬ ১২:৩৯:১৯

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ভোজনরসিকদের কাছে হাঁসের মাংস মানেই বাড়তি আকর্ষণ। আর শীত পড়লেই সেই আকর্ষণ যেন কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ হাঁসের মাংস শরীর উষ্ণ রাখে—এই বিশ্বাস আর স্বাদের টানেই শীত মৌসুমে হাঁসের মাংসের কদর তুঙ্গে। চলমান তীব্র শৈত্যপ্রবাহে তারই প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে সুনামগঞ্জের বহুল পরিচিত ‘হাঁসভাত পয়েন্টে’।

সুনামগঞ্জ–সিলেট মহাসড়কের প্রায় ১৩ কিলোমিটার অগ্রসর হলেই চোখে পড়ে সারি সারি রেস্টুরেন্ট। কয়েক বছর আগেও জায়গাটির নাম ছিল দিরাই সড়ক মোড় বা মদনপুর পয়েন্ট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচয় বদলে এখন এটি পরিচিত ‘হাঁসভাত চত্বর’ নামে। টাঙ্গুয়ার হাওরসহ জেলার পর্যটন স্পটগুলোতে যাতায়াতকারী হাজারো পর্যটকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে এই হাঁসভাতের সুখ্যাতি।

চত্বরে গড়ে ওঠা প্রতিটি রেস্টুরেন্টের নামের সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে ‘হাঁসভাত’। বড় সাইনবোর্ডে চোখে পড়ে—মডার্ন অ্যান্ড রাফি হাঁসভাত রেস্টুরেন্ট, মামুভাগ্নে হাঁসভাত, সাঈদ হাঁসভাত, মেহমানবাড়ি হাঁসভাত, ভাটিবাংলা হাঁসভাত। গত ছয় মাসে যুক্ত হয়েছে আরও সাতটি নতুন রেস্টুরেন্ট। খাবারের মেন্যুতেও বদলে গেছে জায়গার নাম—এখন সবাই একে চেনে হাঁসভাত পয়েন্ট হিসেবেই।

শীত যত বাড়ছে, ভিড়ও তত জমছে। তাহিরপুরের হাওরপাড়ের গ্রাম গোবিন্দশ্রীর বাসিন্দা সেলিম আখঞ্জি বলেন, “গরমকালে হাঁসের মাংস খেতে অস্বস্তি লাগে। শীতে খেলে অন্যরকম স্বাদ পাওয়া যায়। তাই এই সময় হাঁসের মাংসের কদর বেশি।”

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা টাঙ্গুয়ার হাওর বা সীমান্ত এলাকার পর্যটন স্পটে যাওয়ার পথে গাড়ি থামান এখানে। গরম ভাত, ঝোলঝোলা হাঁসের মাংস আর টেপির চাল—সব মিলিয়ে একেবারে ভাটির স্বাদে ভরপুর খাবারেই তৃপ্তি মেটান তারা।

রেস্টুরেন্ট মালিকরা জানান, প্রতিদিন গড়ে আড়াই থেকে তিনশ হাঁস জবাই করে রান্না করতে হয়। কোনো কোনো দিন এই সংখ্যাও কম পড়ে। পর্যটকদের পাশাপাশি সিলেট, হবিগঞ্জ ও আশপাশের উপজেলার তরুণরাও নিয়মিত এখানে এসে হাঁসভাত খাচ্ছেন।

এই হাঁসভাত চত্বরের পথিকৃৎ মডার্ন অ্যান্ড রাফি হাঁসভাত রেস্টুরেন্টের মালিক আতিকুর রহমান। প্রায় আট বছর আগে পাশের মদনপুর গ্রামে ছোট পরিসরে হাঁস রান্না করে কয়েকজন বাসচালক ও হেলপারকে খাওয়ান তিনি। প্রথম দিনেই বিক্রি হয় একটি হাঁস। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ক্রেতা। বাসের স্টাফ থেকে শুরু হয়ে এখন তার রেস্টুরেন্টেই প্রতিদিন শতাধিক হাঁস রান্না হয়।

সকালে হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে দেশি হাঁস নিয়ে আসেন পাইকাররা। চাহিদা অনুযায়ী রেস্টুরেন্ট মালিকরা সেখান থেকেই হাঁস কিনে নেন। এখানে ১৮০ টাকায় মিলছে ভরপেট ভাত ও হাঁসের মাংস। নিয়মিত বা পরিচিত ক্রেতাদের ক্ষেত্রে বাড়তি যত্নও করেন মালিকরা।

রেস্টুরেন্ট মালিকদের দাবি, এখানে কোনো বাসি বা ফ্রিজে রাখা মাংস রান্না করা হয় না। প্রতিদিন নতুন হাঁস জবাই করেই রান্না করা হয়। এ কারণেই স্বাদে আলাদা, আর ক্রেতার ভিড়ও বেশি।

মেহমানবাড়ি হাঁসভাত রেস্টুরেন্টের মালিক মো. আব্দুল কাইয়ুম বলেন, “হাঁসভাত এখন ভাইরাল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ শুধু হাঁসভাত খেতেই আসে।”

সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহ বলেন, “স্থানীয় ঐতিহ্যে পরিণত হতে যাওয়ায় হাঁসভাত পয়েন্টের ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় সহায়তার চেষ্টা করা হবে।”

শীতের কনকনে ঠান্ডায় যেখানে মানুষ কাঁপছে, সেখানে সুনামগঞ্জের এই হাঁসভাত পয়েন্ট হয়ে উঠেছে উষ্ণতার আর স্বাদের মিলনস্থল—যেখানে খাবারের সঙ্গে মিশে আছে হাওরের জীবনধারা ও মানুষের গল্প।

এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad