শাল্লায় পিআইসি গঠনে জালিয়াতি ও ঘুষের অভিযোগ
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় বোরো মৌসুমে হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রকৃত জমির মালিক ও সুবিধাভোগী কৃষকদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, যে এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করা হবে, সেই এলাকার জমির মালিক ও প্রকৃত সুবিধাভোগী কৃষকদের নিয়ে ৫ থেকে ৭ সদস্যের পিআইসি গঠন করার কথা। তবে শাল্লা উপজেলায় চলতি মৌসুমে একাধিক প্রকল্পে এ নীতিমালা মানা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১০৮, ১০৯, ১১৮, ১৪, ৩৩, ১৮, ১১৯, ৭০ ও ২২ নম্বরসহ বিভিন্ন প্রকল্পে প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে এমন ব্যক্তিদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাদের সংশ্লিষ্ট এলাকায় জমি নেই বলে দাবি করা হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ উঠেছে ১০৮ নম্বর পিআইসি প্রকল্প নিয়ে। কালিনিকোটা হাওরের একটি উপ-প্রকল্পে বাঁধ মেরামতের কাজের জন্য গঠিত এই কমিটিতে স্থানীয় জমির মালিকদের রাখা হয়নি বলে অভিযোগ করেন কৃষক খন্দকার হাবিব। তিনি বলেন, বাঁধটির পুরো অংশ তাঁর ও তাঁর পরিবারের রেকর্ডীয় জমির ওপর দিয়ে গেছে। নীতিমালা অনুযায়ী বাঁধ নির্মাণে মাটি সরবরাহের দায়ও তাঁদের ওপর পড়ে। কিন্তু সব তথ্য জমা দেওয়ার পরও তাঁদের নাম কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
খন্দকার হাবিবের অভিযোগ, তদন্তে আসা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী জমি ও কাগজপত্র পরিদর্শন করলেও পরে অকৃষকদের নিয়ে কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
পিআইসি বাস্তবায়ন কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কমিটির সদস্যদের মতামত না নিয়েই সভার আগেই স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, কয়েকটি প্রকল্পে আর্থিক লেনদেন হয়েছে—এমন তথ্য উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হলেও প্রকল্পগুলো বাতিল বা স্থগিত করা হয়নি।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ৭০ নম্বর পিআইসির সভাপতি প্রদীপ চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে ঢাকার উত্তরা পূর্ব থানায় একটি মামলা চলমান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সম্পত্তি সংক্রান্ত জাল কাগজ ব্যবহার করে তিনি পিআইসি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এ ছাড়া নীতিমালায় স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও কিছু প্রকল্পে পাশের উপজেলার বাসিন্দাদেরও কমিটিতে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের আশঙ্কা, বাইরের লোক দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করালে কাজের মান নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হবে। তাঁদের মতে, বাঁধ ভেঙে গেলে ফসলের ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত স্থানীয় কৃষকদেরই বহন করতে হবে।
এই অনিয়মের অভিযোগে পিআইসি বাতিল ও পুনর্গঠনের দাবিতে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং উপজেলা কাবিটা কমিটির সভাপতির কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। অভিযোগের অনুলিপি জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের স্থানীয় নেতারা বলেন, প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে যেভাবে কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। তাঁদের মতে, অযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হলে বোরো ফসল মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রমাণ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রীতম দাস
মন্তব্য করুন: