অতিথি পাখির কলরবহীন টাঙ্গুয়ার হাওর: বিপন্ন জীববৈচিত্র্য, কমছে পর্যটক
নলখাগড়া, হিজল-করচ আর নীল জলের মায়াবী মিতালীতে ঘেরা বিশ্ব রামসার হেরিটেজ সাইট সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর এখন নিস্তব্ধ। শীতের ভরা মৌসুমেও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই মিঠাপানির জলাভূমিতে দেখা মিলছে না কাঙ্ক্ষিত পরিযায়ী পাখির। এক সময়ের মুখর হাওর এখন পরিযায়ী পাখির সংকটে শ্রীহীন হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে পর্যটন শিল্পেও।
উধাও ২১৯ প্রজাতির পাখির মেলা
প্রতি বছর সাইবেরিয়া, চীন, মঙ্গোলিয়া ও নেপালসহ শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসত এই ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হাওরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় এখানে ২১৯ প্রজাতির পাখির বিচরণ ছিল, যার মধ্যে ৯৮ প্রজাতিই ছিল পরিযায়ী। বিরল প্যালাসেস ফিশিং ঈগল, মৌলভী হাঁস, বালিহাঁস, লেঞ্জা ও বেগুনি কালেমের মতো নান্দনিক সব পাখির দেখা মিলত এখানে। তবে বর্তমানে এসব পাখির উপস্থিতি নেই বললেই চলে।
পাখি কমার নেপথ্যে শিকার ও বন উজাড়
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অতীতে নির্বিচারে পাখি শিকারই আজকের এই সংকটের প্রধান কারণ। যদিও গত কয়েক বছর ধরে প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে শিকার অনেকাংশেই বন্ধ হয়েছে। সাবেক জেলা প্রশাসক সাবিরুল ইসলামের সময় থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে অনেক শিকারিকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে।
তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি হাজি খসরুল আলম জানান, "অসাধু শিকারিদের পাশাপাশি হাওরের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিজল-করচ, নলখাগড়া ও চাইল্যা বন বিলুপ্তির পথে থাকায় পাখিরা তাদের নিরাপদ আশ্রয় ও খাবার হারাচ্ছে।"
পর্যটনে ধস
যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলেও পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ায় হাওরে পর্যটকের খরা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী আহমদ কবির জানান, গত দুই বছর ধরে বিদেশি পর্যটকের আগমন প্রায় বন্ধ। দেশীয় পর্যটকের উপস্থিতিও এখন নগণ্য। উন্নয়নকর্মী খসরুল আলমের মতে, পাখির কলরব না থাকলে টাঙ্গুয়ার হাওর তার মূল আকর্ষণ হারিয়ে ফেলবে।
প্রশাসনের নতুন উদ্যোগ ও আশার আলো
বর্তমানে টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় জেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া জানান, "হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার বিশেষ নীতিমালা করেছে। ইতোমধ্যে হাওরের 'কোর' ও 'বাফার' জোনে সব ধরনের ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।"
এই নজরদারি ও বনায়ন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আবারও টাঙ্গুয়ার হাওর পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হবে বলে আশা করছে প্রশাসন।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: