নিভে গেল একাত্তরের কণ্ঠস্বর
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু কিংবদন্তি সাংবাদিক মার্ক টালি আর নেই
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু, বর্ষীয়ান ব্রিটিশ সাংবাদিক ও বিবিসির সাবেক দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা মার্ক টালি পরলোকগমন করেছেন। রোববার (২৫ জানুয়ারি) ভারতের দিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
তার মৃত্যুতে সাংবাদিকতা জগতে এবং বাংলাদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘদিনের সহকর্মী সতীশ জ্যাকব তার মৃত্যুর সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন।
একাত্তরের সেই সাহসী কণ্ঠস্বর
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে মার্ক টালি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির ভরসার প্রতীক। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলার চিত্র তিনি বিশ্ববিবেকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। অবরুদ্ধ দেশে রেডিওর নব ঘুরিয়ে সাধারণ মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত মার্ক টালির দরাজ কণ্ঠের সংবাদের জন্য।
তিনিই ছিলেন সেই বিরল সাংবাদিকদের একজন, যাদের পাকিস্তান সরকার ১৯৭১ সালের এপ্রিলে ঢাকা সফরের অনুমতি দিয়েছিল। সেই সফরের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেছিলেন, “ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার পথে রাস্তার দু’পাশে শুধু পুড়ে যাওয়া গ্রাম দেখেছিলাম। তখনই বুঝেছিলাম ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে।”
বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম
মার্ক টালির জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৪ অক্টোবর কলকাতার টালিগঞ্জে। পেশাগত জীবনের প্রায় ২০ বছর তিনি দিল্লিতে বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, সমাজ ও বিবর্তনকে তিনি অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছেন এবং তুলে ধরেছেন। ১৯৯৪ সালে বিবিসি থেকে অবসরে যাওয়ার পর তিনি ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে কাজ চালিয়ে যান।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে। এ ছাড়াও সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি ব্রিটিশ সরকারের ‘নাইটহুড’ এবং ভারতের ‘পদ্মশ্রী’ ও ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত হন।
তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতার একটি যুগের অবসান হলো। তিনি শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না, ছিলেন ইতিহাসের সাক্ষী এবং নিপীড়িত মানুষের বিশ্বস্ত এক কণ্ঠস্বর।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: