শাল্লায় পিআইসিতে ফ্যাসিস্টদের পুর্নবাসন: ইউএনও’র বিরুদ্ধে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের
সুনামগঞ্জের শাল্লায় হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের পিআইসি গঠনে নানা অনিয়ম, ঘুষ-দুর্নীতি সহ আওয়ামী দোসরদের পুর্নবাসনের অভিযোগ উঠেছে খোদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে। অভিযোগে ঘুষ,অনিয়ম,নীতিমালা লঙ্ঘনসহ ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়- পিআইসিতে স্থানীয় আওয়ামী নেতাকর্মীসহ অনেক পলাতক নেতাকর্মী ও জুলাই বিপ্লব পরবর্তী রাজধানীর ঢাকা উত্তরা পূর্ব থানার মার্ডার মামলার আসামি প্রদীপ চন্দ্র দাসকেও হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের পিআইসি’তে (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) সভাপতি হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, পিআইসিতে কৃষকদেরকে বাদ দিয়ে জমি নেই বা নামমাত্র জমি আছে এমন অনেক জনকে আওয়ামী ফ্যাসিষ্টদের প্রক্সি হিসেবে ঢুকানো হয়েছে হাওরের ফসল রক্ষা কাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। তাছাড়াও প্রায় প্রতিটি প্রকল্পে কাজের তুলনায় অতিরিক্ত লোভনীয় বরাদ্দকে হাতিয়ার করে উপজেলা কাবিটা স্কীম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও সদস্য সচিবকে নিয়ে শাল্লা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম গড়ে তুলেছেন একটি ঘুষ-দুর্নীতির ওপেন-সিক্রেট সিন্ডিকেট। আর উক্ত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় প্রকল্প থেকে দেড় - দুই লাখ টাকা ঘুষ বাণ্যিজ্যের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। বাঁধ সংশ্লিষ্ট প্রকৃত কৃষকদের-অভিযোগ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেনে বুঝেই জমি নেই- এমন লোকদের পিআইসি দিয়েছে।
অন্যদিকে টাকার বিনিময়ে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ উঠলে, সিন্ডিকেটের মূলহোতা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামকে তদন্ত করার দায়িত্ব দিয়ে নতুন নাটকের সৃষ্টি করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস।
এ ব্যাপারে সুবিশাল ছায়ার হাওরভূক্ত ইটনা উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর গ্রামের ক্ষিতিশ চন্দ্র দাস, হরেন্দ্র চন্দ্র দাস সহ অনেকের সাথে কথা হলে তারা বলেন ৭০নং পিআইসি’র সভাপতি প্রদীপ চন্দ্র দাসের বাঁধের আশেপাশে কোনো জমি নেই। তাছাড়াও তিনি(প্রদীপ) ঢাকা উত্তরা পূর্ব থানার একটি মার্ডার মামলার আসামি ও প্রকৃত আওয়ামী দোসর। তারা আরো বলেন, আওয়ামী লীগকে পুর্নবাসনের উদ্দেশ্যেই এরূপ লোকদের পিআইসি দেওয়া হচ্ছে। ওই পিআইসি’র আবেদিত প্রকৃত কৃষক শনিলাল দাস বলেন, শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ উপজেলা কমিটির কিছু অসাধু সদস্য আওয়ামী নেতাদের সক্রিয় রাখার উদ্দেশ্যে মার্ডার মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও আ’লীগ নেতা প্রদীপ চন্দ্র দাসকে সভাপতি করে ৭০নং পিআইসি’র অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। উক্ত পিআইসি’র অনুমোদন বাতিলের জন্য মামলার নথি সহ ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছি, যার মামলা নং ১৩, তারিখ- ২৬/০৯/২৪ ইং। ধারা ১৪৮, ১৪৯, ৩০২ দ:বি:। কিন্তু দু’সপ্তাহ পার হলেও তদন্তের কোন আভাস দেখিনি।
১৬, ৪৩, ৮৮, ১০৪ ও ১০৬ নং পিআইসি’র বাঁধ সংলগ্ন কৃষক মৌরাপুর গ্রামের প্রিতেশ দাস, ভোলানগর গ্রামের রানু রঞ্জন দাস, উজানগাঁও গ্রামের শশংক
শেখর দাস এবং ভাটি ইয়ারাবাদ গ্রামের সোনা মিয়া ও বাবর রায়হানসহ অনেকের সাথে কথা হলে তারা জানান, আমাদের জমির উপর দিয়ে বাঁধ প্রাক্কলিত।
আমরা বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্থ। আমাদের প্রত্যেকের ৩-৪ কেদার জমি নষ্ট হয়েছে। কিন্তু আমাদেরকে পিআইসি না দিয়ে যাদের কোন জমি নেই তাদেরকে বাধেঁর কাজ দেয়া হয়েছে।
পিআইসিতে আওয়ামী লীগকে পুর্নবাসন, যাদের জমি নেই তাদেরকে পিআইসি এমনকি হত্যা মামলার আসামির নথিসহ লিখিত অভিযোগ করার পর আপনি কি পদক্ষেপ নিয়েছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমি লিখিত কোন অভিযোগ পাইনি। লিখিত অভিযোগ পেলে যাচাই করে দেখ ‘।
তবে অভিযোগকারী একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, প্রায় পনের দিন আগে ৬০টিরও বেশি লিখিত অভিযোগ হলেও কোনোরূপ যাচাই-বাছাই করা হয়নি এখনো। অনুরূপ প্রশ্নের জবাবে শাখা কর্মকর্তা উপসহকারী প্রকৌশলী ওবাইদুল হক বলেন, ‘আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি, কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরো বলে আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্টতার ডকুমেন্টস দেখালেও ব্যবস্থা নেব।’
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে প্রকল্প দেওয়ার অভিযোগ আছে, তার দ্বারা সঠিক তদন্ত করা কি সম্ভব-এমন প্রশ্নের
জবাবে উপসহকারী প্রকৌশলী ওবাইদুল হক বলেন, ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দিলে এরও ব্যবস্থা নেয়া হবে। জমির উপর দিয়ে বাঁধ প্রাক্কলিত হওয়ার পরও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পিআইসি না দিয়ে জমি নেই এমন কৃষকদের পিআইসি দেওয়া হয়েছে মর্মে প্রশ্ন করলে উপজেলা কাবিটা কমিটির সাংবাদিক প্রতিনিধি পাভেল আহমেদ বলেন, এমনটা হয়েছে। আমরা মিটিংয়ে ইউএনওর কাছে অভিযোগও করেছি। ইউএনও একজন এসআই সহ
আমাদেরকে তদন্তে পাঠিয়েছেন, আমরা তদন্তের রিপোর্ট মৌখিক ও লিখিতভাবে দিয়েছি। কিন্তু ইউএনও আমাদের রিপোর্ট আমলে না নিয়ে উনি ব্যক্তিগত ভাবে পিআইসি অনুমোদন দিয়েছেন।
ঘুষ-বাণিজ্যের মাধ্যমে পিআইসি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে এমনকি এক উপজেলার লোক অন্য উপজেলায় প্রকল্প পেয়েছে এটা কি নীতিমা বহির্ভূত নয়- এ প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিক পাবেল আহমদ বলেন, ‘আমার জানা মতে ইউএনওর একজন অফিসার আছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী, তিনি পিআইসি বানিজ্য করেছেন। টাকার বিনিময়ে প্রকল্প দেয়ার তথ্য আমাদের কাছে আছে । এ বিষয়ে আইনগত ভাবে একশনে যাব। সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এগুচ্ছি।’
অভিযোগ উঠার পরও কেন তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হল প্রশ্নের জবাবে পাবেল আহমেদ বলেন, আমরা পাবলিক প্রতিনিধিরা প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী যে তদন্ত করতেছে তা প্রশ্নবিদ্ধ। তারপরও উনাকে তদন্তে পাঠাইতেছে, এটা একমাত্র ইউএনওর এখতিয়ার। আমাদের কিছু করার নেই। উপজেলা কাবিটা কমিটির আরেক সদস্য হিমাদ্রী সরকারের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, সব প্রশ্নের জবাব একমাত্র ইউএনও সাহেবই বলতে পারবেন। অপর প্রতিনিধি মনু মিয়ার মুঠোফোনে ফোন করলে তিনি বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।
তাহির আহমদ
মন্তব্য করুন: