সুনামগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধে ধীরগতি ও অনিয়ম: উৎকণ্ঠায় লাখো কৃষক
সুনামগঞ্জের ৯৫টি হাওরের বোরো ফসল রক্ষার লড়াইয়ে আবারও দুশ্চিন্তার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে অনেক বাঁধের কাজই এখনো অসম্পূর্ণ। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কাজের অগ্রগতি ৭৬ শতাংশ দাবি করলেও কৃষক সংগঠনগুলোর অভিযোগ—কাজে ধীরগতি, ব্যাপক অনিয়ম এবং তথ্যের লুকোচুরি চলছে। ফলে আগাম পাহাড়ি ঢল বা আকস্মিক বন্যা শুরু হলে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পাউবোর ‘কাবিটা’ নীতিমালা অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু হয়ে আজ ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক বাঁধে এখনো মাটির কাজ চলছে। তাহিরপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার কৃষকদের দাবি, অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশে এখনো মাটি ফেলা শেষ হয়নি, এমনকি কোনো কোনো বাঁধে কাজের তথ্য সম্বলিত সাইনবোর্ড পর্যন্ত নেই।
চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রায় ১৪ লাখ টন ধান উৎপাদনের কথা, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল সম্পদ রক্ষায় ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের কাজ চলছে ৭১৪টি পিআইসি-র (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) মাধ্যমে।
হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলনের মতে, বাঁধের কাজে শুরু থেকেই ঢিলেমি ছিল। তিনি অভিযোগ করে বলেন "অক্ষত বাঁধে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং দুর্নীতির তথ্য গোপন করতেই অনেক জায়গায় সাইনবোর্ড লাগানো হয়নি। যদি কোনো কারণে হাওরডুবি ঘটে, তবে এর দায় প্রশাসন ও পাউবোকেই নিতে হবে।"
তাহিরপুরের কৃষক সাজিদ মিয়া জানান, অন্য বছর সাইনবোর্ড থাকলেও এবার অনেক জায়গায় তা অনুপস্থিত, ফলে সাধারণ মানুষ জানেই না কত টাকার কাজ হচ্ছে বা কারা করছে।
কাজের বিলম্বের জন্য জাতীয় নির্বাচনকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মো. মামুন হাওলাদার। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, "সবগুলো 'ক্লোজার' (বাঁধের ভাঙা অংশ) ঝুঁকিমুক্ত করা হয়েছে। আগামী ১০ মার্চের মধ্যে শতভাগ কাজ শেষ হয়ে যাবে।" সাইনবোর্ড প্রসঙ্গে তিনি জানান, শুরুতে লাগানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা চুরি হয়ে গেছে।
আবহাওয়া পরিবর্তনের এই সময়ে পাহাড়ি ঢল যেকোনো মুহূর্তে শুরু হতে পারে। কৃষকদের আশঙ্কা, মাটির কাজ শেষ হলেও তা থিতু হতে সময় লাগে। কাঁচা মাটি থাকা অবস্থায় পানি চলে আসলে বাঁধ টেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। শান্তিগঞ্জের কৃষক রকিব উদ্দিনের ভাষায়, "চারা রোপণ হয়েছে দুই মাস আগে, কিন্তু এখনো আমাদের ঘর রক্ষার দেয়ালই ঠিক হয়নি। ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব।"
এখন দেখার বিষয়, বর্ধিত ১০ দিনের মধ্যে পাউবো আদৌ কাজ শেষ করতে পারে কি না, নাকি গত কয়েক বছরের মতো এবারও কৃষকের স্বপ্ন বালির বাঁধের মতোই ভেঙে পড়ে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: