সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
‘অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও ট্রাফিক ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে সরকার’
দেশে সুশাসন ও আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করা, গুরুতর অপরাধে জড়িতদের অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের আওতায় আনা এবং ঢাকা মেগাসিটির ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এক অভাবনীয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনে বর্তমান সরকার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে; অপরাধী বা গডফাদার রাজনৈতিক কিংবা সামাজিকভাবে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, দেশের প্রচলিত কঠোর আইনানুযায়ী তাদের অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান সম্মেলন কক্ষে সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মেগা মামলার অগ্রগতি ও ট্রাফিক অটোমেশনসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে এসব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের আলোচিত মামলার অগ্রগতি নিয়ে বলেন, দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টিকারী বহুল আলোচিত রামিসা হত্যা মামলার বিচার কাজ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে এবং আজ আদালতে মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য ছিল। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরে জানান, এই মামলার মোট ১২ জন তালিকাভুক্ত সাক্ষীর মধ্যে ইতোমধ্যে ১১ জনের পুঙ্খানুপুঙ্খ সাক্ষ্য গ্রহণ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং আজ বিজ্ঞ আদালতে নিহত রামিসার পোস্টমর্টেম ও ফরেনসিক রিপোর্টের ওপর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত সাক্ষ্য অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিচারাধীন কোনো স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি মন্তব্য করা আইনিভাবে সমীচীন নয় উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা ও মামলার মূল সাক্ষীদের যথাসময়ে আদালতে সশরীরে উপস্থাপন নিশ্চিত করাসহ রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশনকে যাবতীয় আইনি ও লজিস্টিক সহায়তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রদান করা হচ্ছে; দেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও রেকর্ড সময়ের মধ্যে যেন এই চাঞ্চল্যকর বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, সরকার আইনগতভাবেই সেই বিশেষ ব্যবস্থা করছে। তবে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্ব শেষ হওয়ার পর আসামিকে দোষী বা নির্দোষ সাব্যস্ত করার আইনি প্রক্রিয়া, উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক এবং চূড়ান্ত রায়ের দিন ধার্য করার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন আদালতের এখতিয়ার বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক বেশ কিছু চোখধাঁধানো সফলতার দৃষ্টান্ত টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় এক কিশোরীকে নির্মমভাবে গণধর্ষণ ও হত্যা করে লাশ গুমের উদ্দেশ্যে নদীতে ফেলে দেওয়ার লোমহর্ষক ঘটনায় পুলিশ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে; আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার ট্র্যাকিং প্রয়োগ করে ইতোমধ্যে ঘটনার সাথে জড়িত ৪ জন প্রধান আসামিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তারা বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজেদের দোষ স্বীকার করে লোমহর্ষক ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে, যা অপরাধ দমনে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি উল্লেখযোগ্য ও পেশাদার অগ্রগতি।
রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে আইসিইউতে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি বিশেষ উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ টিম ইতোমধ্যে সরজমিনে হাসপাতালটি পরিদর্শন ও তদন্ত করেছেন; প্রাথমিকভাবে সেন্ট্রাল এয়ারকন্ডিশন বন্ধ থাকা, সাফোকেশন বা অন্য কোনো যান্ত্রিক ও কারিগরি গাফিলতির বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে থানায় সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছে বিধায় পুলিশ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। শিশু মৃত্যুর পর অনেক সময় ধর্মীয় আবেগের কারণে ময়নাতদন্ত বা পোস্টমর্টেম না করার বিষয়ে মন্ত্রী দেশের সাধারণ অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করে বলেন, ময়নাতদন্তের অকাট্য মেডিকেল রিপোর্ট ছাড়া মামলা পরিচালনা করলে বিচার কার্যের চূড়ান্ত একপর্যায়ে আইনি ফাঁকফোকর গলে আসামিপক্ষ বড় ধরনের আইনি সুবিধা (বেনিফিট অব ডাউট) পেয়ে মামলা থেকে খালাস পেয়ে যাওয়ার চরম আশঙ্কা থাকে; তাই প্রয়োজনে আইনি প্রক্রিয়া মেনে ও সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে কবর থেকে লাশ উত্তোলন (এক্সহিউমেশন) করেও নিখুঁত ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব। একই হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকালে পেশাগত দায়িত্ব রত সাংবাদিকদের ওপর হাসপাতাল স্টাফদের বর্বরোচিত ও ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনাকে ‘চরম স্বাধীনতাবিরোধী’ আখ্যায়িত করে এর তীব্র নিন্দা জানান মন্ত্রী; তিনি আশ্বস্ত করেন যে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট নামীয় মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ জড়িতদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার ও কঠোর তদন্ত নিশ্চিত করবে।
সদ্য সমাপ্ত পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপনকালে দেশজুড়ে অত্যন্ত নিরাপদ পরিবেশ বজায় থাকা এবং মহাসড়কসহ ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সন্তোষ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়ে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ও সুনজরদারিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন (ডিএমপি) এলাকায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমবারের মতো অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স - AI) এবং স্বয়ংক্রিয় থার্মাল ক্যামেরা প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে (ট্রায়াল বেসিস) সফলভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে; এর ফলে ট্রাফিক আইন অমান্যকারী ও যত্রতত্র লেন পরিবর্তনকারীদের বিরুদ্ধে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজিটাল মামলা ও ই-প্রসিকিউশন রুজু হচ্ছে। তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানান যে, এই প্রযুক্তির সুফল হিসেবে এখন গভীর রাতেও রাজধানীর চালকেরা ফাঁকা রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে গাড়ি থামাচ্ছেন, যা দেশের সুশাসনের এক অনন্য প্রতীক; বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ এবং বুয়েটের (BUET) আইটি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে এই ট্রাফিক অটোমেশনকে আরও পূর্ণাঙ্গ ও স্মার্ট রূপ দেওয়া হচ্ছে এবং আগামী মাত্র ১ থেকে ২ মাসের মধ্যে পুরো ঢাকা সিটিতে এক দৃশ্যমান ও বৈপ্লবিক ট্রাফিক পরিবর্তন দেখা যাবে। ঢাকা সিটিতে এই পাইলট প্রজেক্ট সম্পূর্ণ সফল হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে এই অত্যাধুনিক ‘এআই ট্রাফিক সিস্টেম’ দেশের অন্যান্য বড় বড় মেগাসিটি ও মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোতেও সম্প্রসারণ করা হবে। তবে রাজধানীতে যত্রতত্র ও প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও টমটমের অবাধ চলাচল আধুনিক এই স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, মানবিক দিক ও দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনা করে রাতারাতি তাদেরকে সম্পূর্ণ বেকার বা উচ্ছেদ না করে, মেট্রো বা মূল ভিআইপি এলাকার বাইরে ঢাকা সিটির উপকণ্ঠে কীভাবে তাদের পুনর্বাসন বা বিকল্প কোনো আয়ের উৎস নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে।
আসন্ন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) মহাপরিচালক বা ডিজি পর্যায়ের নিয়মিত বার্ষিক সীমান্ত বৈঠক প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এটি দুই দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় একটি অত্যন্ত নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া; এবারের উচ্চপর্যায়ের ডায়ালগে আন্তর্জাতিক সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অস্ত্র পাচার রোধ, চোরাচালান বন্ধ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শক্তভাবে উত্থাপন করা হবে। এ সময় বহুল আলোচিত সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যাখ্যা ও সরকারের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্য কোনো দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী যদি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আমাদের সার্বভৌম সীমানায় বা নো-ম্যানস ল্যান্ডের জিরো লাইনে এসে কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটায়, তবেই আন্তর্জাতিক পরিভাষায় তা ‘সীমান্ত হত্যা’ হিসেবে গণ্য হয় এবং তার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়; কিন্তু যদি উভয় দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তের অনেক অভ্যন্তরে কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ, কাটাতার কাটা বা চোরাচালানজনিত অপরাধের কারণে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তবে তা সংশ্লিষ্ট দেশের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ ও ফৌজদারি আইনে নিয়ন্ত্রিত ও বিচার হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক ক্ষমতার রদবদলের পর বাংলাদেশে কোনো ধরনের অবৈধ পুশইনের আশঙ্কার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে স্পষ্ট করে বলেন, বর্তমান সরকার যেকোনো ধরনের অবৈধ ও জোরপূর্বক ‘পুশইন’ বা ‘পুশব্যাক’ নীতির সম্পূর্ণ আদর্শগত ও কঠোর বিরোধী; বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষায় এবং যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখে দিতে বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় (অ্যালার্ট) রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে যদি কখনো কোনো নাগরিকের ন্যাশনাল আইডি ভেরিফিকেশন বা এনআরসি সংক্রান্ত কোনো তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, তবে তা দুই দেশের প্রচলিত কূটনৈতিক ফ্রেমওয়ার্ক ও দ্বিপাক্ষিক আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করা হবে; তবে বর্তমানে এ জাতীয় বা এই সম্পর্কিত কোনো বিতর্কিত বিষয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পেন্ডিং বা প্রক্রিয়াধীন নেই। সবশেষে ব্রিফিংয়ের শেষাংশে মন্ত্রিসভা নতুন করে পুনর্গঠন বা রদবদল সংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক রাজনৈতিক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী মুচকি হেসে বলেন, এটি সম্পূর্ণভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব সাংবিধানিক একক এখতিয়ার, এই বিষয়ে অন্য কারো আগাম মন্তব্য বা কথা বলার কোনো আইনি সুযোগ নেই।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: