শ্রীমঙ্গলে দুই দিনের ব্যবধানে একই স্থানে ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে দুই যাত্রীর মৃত্যু
গণপরিবহন হিসেবে রেলওয়ের চলন্ত ট্রেনের ছাদে চড়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও বেআইনি ভ্রমণের মারাত্মক ঝুঁকি আবারও এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি তাজা প্রাণ কেড়ে নিল। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার উত্তরসুর দ্বারিকা পাল মহিলা ডিগ্রি কলেজ সংলগ্ন রেললাইন এলাকায় মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে চলন্ত ট্রেনের ছাদ থেকে নিচে ছিটকে পড়ে দুই যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং একই ঘটনায় আরও অন্তত তিন যাত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল রোববার (৭ জুন) দুপুরের দিকে সিলেট রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর ‘পাহাড়িকা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ছাদ থেকে শ্রীমঙ্গলের ওই নির্দিষ্ট স্থানে অসাবধানতাবশত নিচে পড়ে গিয়ে আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতনামা যুবকের ঘটনাস্থলেই করুণ মৃত্যু হয়; মেগা এই একই ছাদ পতনের দুর্ঘটনায় ছিটকে পড়ে সামছু মিয়া (৩০) নামের আরেক যুবক রেললাইনের পাশে পড়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙে গুরুতর আহত হন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, আজ দুর্ঘটনায় পতিত হওয়া নিহত অজ্ঞাত যুবক ও আহত সামছু মিয়া উভয়েরই স্থায়ী বাড়ি রংপুর জেলায়। ঘটনার পরপরই স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানার (জিআরপি) একদল পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহতের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য থানায় নিয়ে আসে।
শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম দুর্ঘটনার নির্মম সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আজ দুপুরে পাহাড়িকা ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে নিহত হওয়া যুবকের সঠিক নাম-পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তাঁর পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পুরো বিষয়টি বর্তমানে রেল পুলিশের নিখুঁত তদন্তাধীন রয়েছে এবং এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা দায়েরের আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে; এদিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ট্রেন থেকে ছিটকে পড়ে হাত-পায়ে মারাত্মক চোট পাওয়া আহত সামছু মিয়াকে স্থানীয়রা দ্রুত হাসপাতালে এনে ভর্তি করলে তাকে প্রাথমিক ও জরুরি ট্রমা চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যানুযায়ী, এর ঠিক আগের দিন অর্থাৎ গত শনিবার (৬ জুন) বিকেলের দিকে ঠিক একই স্থানে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী আন্তঃনগর ‘জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ছাদ থেকে একইভাবে পা পিছলে নিচে পড়ে গিয়ে এনামুল মিয়া ফাহিম (২৫) ও মো. সিয়াম (১৮) নামের দুই তরুণ ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে গুরুতর আহত হন। সে সময় বিকট শব্দ পেয়ে শ্রীমঙ্গল ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও রেলওয়ে থানার পুলিশ সদস্যরা যৌথভাবে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করেন; পরবর্তীতে সেখানে তাদের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। সেখানে এনামুল মিয়া ফাহিমের রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় ও শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়, তবে সিলেট পৌঁছানোর পথেই না ফেরার দেশে চলে যান তিনি; হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত অপর যুবকের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বলে রেল পুলিশ নিশ্চিত করেছে। শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম দুই দিনের এই জোড়া মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “গতকাল ঠিক একই স্থানে চলন্ত জয়ন্তিকা ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে দুইজন গুরুতর আহত হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে একজন পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন; আজ আবার ঠিক একই স্থানে পাহাড়িকা ট্রেনের ছাদ থেকে ছিটকে পড়ে আরেকটি বড় দুর্ঘটনায় আরও একজন অজ্ঞাত যুবকের প্রাণ গেল, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।” রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের ভয়াবহ ও নিশ্চিত জীবননাশের ঝুঁকি সম্পর্কে বারবার মাইকিং ও কঠোর আইনি সতর্কতা জারি করা সত্ত্বেও এক শ্রেণীর অসচেতন যাত্রী তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে স্টেশনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ছাদে উঠছেন; দুই দিনের ব্যবধানে শ্রীমঙ্গলের একই স্পটে দুটি পৃথক দুর্ঘটনা এবং দুই-দুটি তরতাজা প্রাণহানির এই লোমহর্ষক ঘটনা নতুন করে ট্রেনের ছাদে যাতায়াত চিরতরে বন্ধে রেলওয়ের কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিকে সর্বস্তরে জোরালো করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ‘ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ’ প্রসঙ্গে শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার শিপলু সূত্রধর তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে গণমাধ্যমের সামনে বলেন, “চলন্ত ট্রেনের ছাদে উঠে ট্রেন যাত্রা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক; এতে সামান্য ভারসাম্য হারালেই চাকার নিচে পড়ে প্রাণনাশের সম্ভাবনা শতভাগ থাকে। তাই আমরা স্টেশনে সব সময় যাত্রীদের ট্রেনের ছাদে উঠাকে কঠোরভাবে নিষেধ ও বাধা দিয়ে থাকি; কিন্তু এক শ্রেণির অতি-উৎসুক ও বখাটে ছেলেরা টিকিট না কেটে এই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি চোরের মতো করে নিজের মূল্যবান জীবনকে চরম বিপদের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে প্রাণ দিয়ে।”
শাহিন আহমেদ/এআর
মন্তব্য করুন: