দেবোত্তর স্টেট নাকি জেলা পরিষদ
যাদুকাটা নদীর খেয়াঘাট মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতা ও চরম উত্তেজনা
সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিয়ারচড়-পাঠানপাড়া খেয়াঘাটের প্রকৃত মালিকানা এবং হাইকোর্টের নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে ইজারা দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তীব্র আইনি জটিলতা ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দেবোত্তর স্টেটের আইনি সত্যতা ও বৈধ্য ইজারাসূত্রে ঘাটের টোল আদায়ের অধিকার দাবি করছেন ইজারাদার শিশির আহমদ। তাঁর অভিযোগ, মহামান্য হাইকোর্টের বিচারাধীন মামলার নিষেধাজ্ঞা এবং আইনি নির্দেশনা উপেক্ষা করে জেলা পরিষদ সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে খাস আদায়ের নামে অন্য একটি পক্ষকে ঘাট পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে, যা আদালতের অবমাননার শামিল।
আইনি নথি ও মামলা সূত্রে জানা যায়, হাইকোর্ট বিভাগে একটি সিভিল রিভিশন মামলা (নং ২৭ ৪০/২০২৪) বিচারাধীন থাকায় বিন্নাকুলি, লাউড়েরগড়, বড়ণ্ডপটিলাগাঁও ও মিয়ারচর খেয়াঘাটগুলোতে নতুন কোনো দরপত্র বিজ্ঞপ্তি জারির আইনি এখতিয়ার জেলা পরিষদের ছিল না। আইনজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, স্বত্ব নিয়ে বিতর্ক ও বিষয়টিতে আদালতের স্থগিতাদেশ বা বিচারপ্রক্রিয়া চলমান থাকায় জেলা পরিষদের এই ঘাটে হস্তক্ষেত্রের সুযোগ নেই। তবে অভিযোগ উঠেছে, জেলা পরিষদ খাস আদায়ের অযুহাতে এক প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে অনৈতিক সুবিধা সুবিধা দিয়ে রাজস্ব আত্মসাৎ ও পারাপারকারীদের জিম্মি করার পরিবেশ তৈরি করেছে।
ইজারাদার শিশির আহমদ জানান, আমি দেবোত্তর স্টেটের নির্ধারিত ও বৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ঘাটের ইজারা লাভ করেছি। যাদুকাটা নদীর এই অংশটি ঐতিহাসিকভাবেই দেবোত্তর স্টেটের ভূমির অংশ। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমরা অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে এসেছি। কিন্তু মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও জেলা পরিষদ কীভাবে মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ লঙ্ঘন করে অন্য পক্ষকে আদেশপত্র দেয়? একটি গোষ্ঠী দীর্ঘদিন জেলা পরিষদের নাম ভাঙিয়ে একচ্ছত্র অবৈধ দখলদারি চালিয়ে আসছে। আমরা দেবোত্তর স্টেটের স্বত্ব রক্ষা ও সাধারণ মানুষকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাতে ঘাটে দাঁড়িয়েছি।
অন্যদিকে, নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকে ভিন্ন দাবি করেছেন অপর ইজারাদার মোঃ ওয়াহিদ মিয়া। তিনি বলেন, আমরা কোনো বেআইনি কাজ করছি না। সরকার ও জেলা পরিষদের নিয়ম মেনেই ইজারা পেয়েছি। গত ১৩-১৪ বছর ধরে আমরা জেলা পরিষদ থেকে বৈধভাবে ইজারা নিয়ে শত শত মানুষ ও যানবাহন নিরাপদে পারাপার করে আসছি। এখন হঠাৎ একটি পক্ষ দেবোত্তর স্টেটের ভুয়া মালিকানা দাবি করে আমাদের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। জেলা পরিষদ কর্তৃক ৪২ লক্ষ টাকায় খাস আদায়ের যে অনুমতি আমাদের দেওয়া হয়েছে, তা পুরোপুরি সরকারি বিধি মোতাবেক।
এদিকে খেয়াঘাটের প্রকৃত স্বত্ব নিয়ে দেবোত্তর স্টেটের মালিকানী স্বাধিকারী কালী চরণ দত্ত চৌধুরী (ভজন) বলেন, ঘাটের মূল ভূমির মালিক দেবোত্তর স্টেট। শিশির আহমদকে বৈধভাবে ইজারা দেওয়া হয়েছে। দেবোত্তর স্টেটের সম্পত্তিতে জেলা পরিষদের খাস আদায় বা ইজারা দেওয়ার কোনো আইনি এখতিয়ার নেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিগত ২৩ জুলাই সকালে শিশির আহমদের পক্ষ থেকে কাগজপত্র ও আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে টোল আদায় করতে গেলে অন্য পক্ষটি বাধা দেয়। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয় এবং খেয়া পারাপার সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয়। শিশির আহমদের অনুসারীদের দাবি, অসাধু চক্রটি ভুয়া ইজারা দেখিয়ে স্থানীয় সাধারণ যাত্রী ও পর্যটকদের কাছ থেকে দিনের পর দিন অতিরিক্ত টোল আদায় করে আসছে।
আইনি নথি অনুযায়ী, জেলা পরিষদের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে হাইকোর্টের আদেশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি—আইনি জট দ্রুত নিরসন করে সাধারণ পারাপারকারী ও পর্যটকদের ভোগান্তি কমাতে এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশাসনকে অবিলম্বে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রীতম দাস/ তাহির আহমদ
মন্তব্য করুন: