মাগুরছড়া ট্রাজেডির ২৯ বছর: আজও মেলেনি ১৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ
আজ রবিবার (১৪ জুন) মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জবাসীর বুক চাপা এক দীর্ঘশ্বাস, একরাশ ক্ষোভ আর বিভীষিকাময় এক ঐতিহাসিক স্মৃতির দিন; কালের পরিক্রমায় বর্ষপঞ্জির পাতা ঘুরে বর্ষার এই দিনে আবারও ফিরে এসেছে এ দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ খনিজ বিপর্যয় ও পরিবেশ ধ্বংসযজ্ঞের স্মারক ‘মাগুরছড়া ট্রাজেডি’র ২৯তম কালো বার্ষিকী। দেখতে দেখতে মাগুরছড়া মহাবিপর্যয়ের খতিয়ানে আজ যুক্ত হলো আরও একটি দীর্ঘ বছর; তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, দীর্ঘ ২৯টি বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত দায়ী সংশ্লিষ্ট বিদেশি তেল-গ্যাস কোম্পানির কাছ থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য ও পাওনা ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেনি কোনো সরকার। ফলে বছরের পর বছর ধরে কমলগঞ্জবাসীর হৃদয়ে জমে থাকা গভীর দীর্ঘশ্বাসের সাথে আজও মিশে আছে রাষ্ট্রীয় অবহেলা আর একরাশ চরম ক্ষোভ।
আজ থেকে ঠিক ২৯ বছর আগে ১৯৯৭ সালের ১৪ই জুন মধ্যরাতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া গ্যাসকূপে ড্রিলিং (খনন) কাজ চলাকালে মার্কিন তেল ও গ্যাস উত্তোলনকারী রাক্ষুসে প্রতিষ্ঠান ‘অক্সিডেন্টাল’-এর চরম খামখেয়ালিপনায় এক ভয়াবহ ও প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ ঘটে। সেই বিস্ফোরণের বিকট ও বজ্রসম শব্দে মুহূর্তের মধ্যে কেঁপে উঠেছিল পুরো কমলগঞ্জসহ মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ জনপদ; বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট আগুনের লেলিহান শিখা ও গনগনে লাল আলোতে আক্ষরিক অর্থেই রূপালী রাত হারিয়ে লাল হয়ে উঠেছিল মৌলভীবাজার জেলার সুনীল আকাশ। গভীর রাতে আকাশচুম্বী সেই ভয়াবহ আগুন দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত গ্রামীণ সাধারণ মানুষ ঘরের মূল্যবান মালামাল ফেলে রেখে স্রেফ নিজেদের জীবন বাঁচাতে ও অবুঝ সন্তানদের নিয়ে দিগ্বিদিক ও নিরাপদ আশ্রয়ের পানে ছুটে চলেছিল। আগুনের সেই লেলিহান শিখা মুহূর্তের মধ্যে পুড়িয়ে লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মাইলের পর মাইল সংরক্ষিত চিরহরিৎ বনাঞ্চল, শত বছরের প্রাচীন চা বাগান ও ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী খাসিয়া সম্প্রদায়ের পানের জুম; মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সিলেটের সাথে যোগাযোগের একমাত্র রেলপথ, পিচঢালা সড়কপথ এবং প্রধান বিদ্যুৎ সঞ্চালন হাইভোল্টেজ লাইন। চোখের পলকে জীবন্ত পুড়ে ছাই হয়ে যায় বনের শতশত দুর্লভ বন্যপ্রাণী, বিলুপ্তপ্রায় বানর, হরিণ, সাপ ও পাখি এবং হাজার হাজার কোটি টাকার অমূল্য জীববৈচিত্র্য; দেশের ইতিহাসের এই অন্যতম ভয়াবহ ও মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনার জন্য এককভাবে দায়ী ছিল তৎকালীন মার্কিন গ্যাস উত্তোলনকারী বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টাল।
পরিবেশবাদী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংগঠনের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যমতে, মাগুরছড়ার এই স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে বনের অন্তত ৬৩ প্রজাতির পশুপাখির সম্পূর্ণ বিনাশ সাধন হয় এবং আগুনে রেললাইন গলে যাওয়ায় সিলেটের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের রেল যোগাযোগ দীর্ঘ ১৬৩ দিন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে; সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় ও পরিবেশের মোট ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক পরিমাণ ধরা হয়েছিল প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টাল আন্তর্জাতিক চাপের মুখে স্থানীয় ক্ষয়ক্ষতির যৎসামান্য ও আংশিক অর্থ পরিশোধ করলেও মূল ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি বন বিভাগ আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের কানাকড়িও ক্ষতিপূরণ পায়নি। পরবর্তীতে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ ফাঁকি দিয়ে ও অমীমাংসিত রেখেই অক্সিডেন্টাল তাদের মালিকানা অপর মার্কিন কোম্পানি ‘ইউনিকল’-এর কাছে হস্তান্তর করে চতুরতার সাথে বাংলাদেশ থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যায়; আর সর্বশেষ ইউনিকলের হাত ঘুরে এই গ্যাসক্ষেত্রটির বর্তমান মালিকানা রয়েছে মার্কিন বহুজাতিক জায়ান্ট ‘শেভরন’ (Chevron)-এর কাছে। শেভরন পরবর্তীতে ২০০৮ সালে এই লাউয়াছড়া ও মাগুরছড়া বনে পুনরায় ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূতাত্ত্বিক জরিপ কাজ সম্পন্ন করে, যে জরিপের তীব্র কম্পন ও বিস্ফোরণেও স্থানীয়ভাবে ঘরবাড়ি ফেটে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়া ২০১২ সালে শেভরন মৌলভীবাজার ১৪ নম্বর ব্লকের অধীনে ঐতিহ্যবাহী নূরজাহান, ফুলবাড়ি এবং জাগছড়া চা বাগানের আদিম সবুজ বেষ্টনী ও হাজার হাজার ছায়াবৃক্ষ কেটে একের পর এক নতুন কূপ খনন করে; বর্তমানে এসব কূপ থেকে চা বাগানের বুক চিরে দীর্ঘ ড্রেন খনন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে উত্তোলিত প্রাকৃতিক গ্যাস কালাছড়া প্ল্যান্টের মাধ্যমে রশীদপুর জাতীয় গ্রিডে পাচার ও স্থানান্তর চলছে। তবে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও রহস্যজনক বিষয় হলো, মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির দীর্ঘ ২৯টি বছর পার হয়ে গেলেও এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা আজও জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি এবং আদায় হয়নি রাষ্ট্রের পাওনা ক্ষতিপূরণ।
দীর্ঘদিন ধরে মাগুরছড়া দুর্ঘটনার যথাযথ ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবিতে মাঠপর্যায়ে আন্দোলন পরিচালনা করে আসা স্থানীয় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ রক্ষা কমিটির প্রবীণ নেতৃবৃন্দরা জানান, বিগত ২৯ বছরেও ক্ষতিগ্রস্তদের দাবিকৃত ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টি পুরোপুরি অমীমাংসিত ও হিমাগারে পড়ে রয়েছে; উপরন্তু, গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের মূল কারণ অনুসন্ধানের জন্য তৎকালীন সরকারের গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ও ফাইন্ডিংস আজ পর্যন্ত জনসম্মুখে বা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি। তৎকালীন ও পরবর্তী সরকারগুলো মার্কিন কোম্পানির সাথে কূটনৈতিক টেবিলে বসে ক্ষতিপূরণ আদায়ে কোনো প্রকার জোরালো বা দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করেনি; ফলে মাগুরছড়া দুর্ঘটনার ২৯তম বার্ষিকী পূর্ণ হলেও আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতার কারণে আজও ক্ষতিপূরণ না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কমলগঞ্জের সাধারণ চা শ্রমিক ও বনবাসীরা নীরবে চোখের জল ফেলছেন, যার কারণে মৌলভীবাজার তথা পুরো সিলেট বিভাগের সচেতন জনমনে ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। বর্তমানে গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের সেই পরিত্যক্ত ও অভিশপ্ত এলাকার উত্তর টিলায় সরকারিভাবে কিছু কৃত্রিম সবুজায়ন করা হলেও মূল কূপটি এখনো একটি বিশাল ও গভীর কুচকুচে কালো পানির পুকুরের মতো আকার ধারণ করে দুর্ঘটনার জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে; চারদিকে লোহার কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সাধারণের জন্য একটি নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হলেও টিলার ওপর সবুজ বনায়নের সরকারি উদ্যোগ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং অগ্নিকান্ডের নির্মম সাক্ষী মূল কূপের চারিপাশ আজও সম্পূর্ণ ন্যাড়া ও গাছপালাহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
ভয়াবহ সেই গ্যাসকূপ বিস্ফোরণে সশরীরে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মাগুরছড়া খাসিয়াপুঞ্জির হেডম্যান ও প্রবীণ বাসিন্দা জিডিসন প্রধান সুচিয়াং নিজের কান্নাজড়িত কণ্ঠে ক্ষোভ প্রকাশ করে এই প্রতিবেদককে বলেন, “২৯ বছর আগের ওই কালরাতের আগুনের মধ্য দিয়ে আমাদের লাউয়াছড়া প্রাকৃতিক বনের ও আদিবাসীদের কী পরিমাণ অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা আমরা যারা যুগ যুগ ধরে এই বনে জীবন বাজি রেখে বসবাস করছি তারা ছাড়া বাইরের কোনো মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় এবং শহরের বড় বড় সাহেবরা কোনোদিন তা বুঝতেও পারবে না।” এ বিষয়ে লাউয়াছড়া সরকারি বন রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক দুর্ঘটনার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব স্বীকার করে গণমাধ্যমের সামনে বলেন, “মাগুরছড়া ট্রাজেডিতে আমাদের আমাজন খ্যাত লাউয়াছড়া প্রাকৃতিক বনের যে জীববৈচিত্র্য ও বনজ সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, তা কোনো কাল বা অর্থ দিয়েই কোনো সময়ে পুষিয়ে ওঠার নয়; গ্যাসক্ষেত্রে অগ্নিকান্ডে বনের ক্ষতি নিরূপণ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও আমার জানামতে বনবিভাগ আজ পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ বা বিশেষ ফান্ড পায়নি।”
এদিকে ঐতিহাসিক এই কালো দিবসটি উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও কমলগঞ্জের পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সামাজিক বিভিন্ন সংগঠন মার্কিন কোম্পানির কাছ থেকে পাওনা ক্ষতিপূরণ দ্রুত আদায় এবং দীর্ঘ বঞ্চিত কমলগঞ্জবাসীর ঘরে ঘরে অবিলম্বে আবাসিক গ্যাস সংযোগ সরবরাহের দ্বিমুখী দাবিতে আজ রবিবার দুপুরের দিকে মাগুরছড়ার মূল ফটকের সামনে বিশাল মানববন্ধন, কালো ব্যাজ ধারণ ও প্রতিবাদ সভাসহ নানা আলটিমেটামভিত্তিক কর্মসূচি পালন করার কথা রয়েছে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: