উদ্ধারে নীরব প্রশাসন!
কোম্পানীগঞ্জে পাহারাতেই 'ভ্যানিশ' কোটি টাকার পাথর
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় অবৈধ পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) পরিচালিত অভিযানে জব্দ করা বিপুল পরিমাণ পাথর চুরির অভিযোগ উঠেছে। তবে সবচেয়ে বড় রহস্যের জন্ম দিয়েছে প্রশাসনের ভূমিকা—জব্দকৃত কোটি টাকার পাথর উদ্ধারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিয়েই তড়িঘড়ি করে আবারও নতুন করে পাথর জব্দ করা হচ্ছে।
বিএমডির দুটি অভিযানে মোট প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ করা হলেও এর মধ্যে শাহ আরেফিন টিলায় জব্দ করা প্রায় ১ লাখ ১ হাজার ঘনফুট পাথর দুই দিনের মাথায় কীভাবে পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া হলো, তা নিয়ে স্থানীয়দের মনে নানা প্রশ্নের দানা বাঁধছে।
গত ৯ এপ্রিল শাহ আরেফিন টিলায় অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে উত্তোলিত ১ লাখ ১ হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ করেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈকত রায়হান। পাথরগুলো স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জিম্মায় রাখা হলেও মাত্র দুই দিনের মাথায় পুরো পাথরই রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায়।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, চুরি হওয়া পাথরের একটি অংশ চিকাডহর গ্রামের একটি বাড়ির আশপাশে লুকিয়ে রাখা হয়েছে এবং বাকি অংশ একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গোপনে বিক্রি করা হয়েছে।
ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জিয়াদ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "পাথর চুরির বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তাকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।" ফলে পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মনে গভীর সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
এদিকে, শাহ আরেফিন টিলার জব্দকৃত পাথর নিলামে বিক্রির জন্য খনিজ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলে পাড়–য়া গ্রামের সিরাজুল ইসলাম তা ক্রয় করেন। ভ্যাটসহ প্রতি ঘনফুট ৯৭ থেকে ১০০ টাকা দরে পাথর কিনলেও বাস্তবে সেখানে কোনো পাথরের অস্তিত্বই খুঁজে পাননি তিনি।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, "আমরা ১ লাখ ১ হাজার ঘনফুট পাথর নিলামে কিনেছি। কিন্তু এরই মধ্যে সব পাথর চুরি হয়ে গেছে। বিএমডির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান পাইনি। পাথর বুঝে না পাওয়ায় বাকি অর্থও জমা দিতে পারছি না।"
পুরোনো পাথর উধাও হওয়ার রহস্য উদ্ঘাটন না করেই গত ১৩ জুলাই উপজেলার উত্তর রনিখাই ইউনিয়নের উৎমা এলাকায় আবারও অভিযান চালিয়ে ৯৪ হাজার ৩৯০ ঘনফুট পাথর জব্দ করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈকত রায়হান। এই পাথরগুলোও আবারও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জিম্মায় রাখা হয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয়রা নতুন করে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
দায়িত্ব এড়ানোর সুর শোনা গেছে অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈকত রায়হানের কণ্ঠে। তিনি বলেন, "আমি অভিযান পরিচালনা ও পাথর জব্দ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করি। পরবর্তী ব্যবস্থা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে।"
অন্যদিকে, বিএমডির পরিচালক (যুগ্মসচিব) মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল এই চুরির দায় স্থানীয় প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বলেন, "জব্দ পাথর চুরির বিষয়ে আমাদের জানা নেই। স্থানীয় প্রশাসনের পাথরগুলো দেখভালের দায়িত্ব ছিল। যদি চুরি হয়ে থাকে, তাহলে তা উদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
কোটি টাকার সরকারি সম্পদ উধাও হওয়ার পর প্রশাসনের এমন "দায় এড়ানোর খেলা" পুরো ঘটনাটিকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ ও রহস্যময় করে তুলেছে।
ডিডি
মন্তব্য করুন: