ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে শাল্লার ঘাটে নৌকার মাঝি সুমিত্রা

ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে শাল্লার ঘাটে নৌকার মাঝি সুমিত্রা

নিজস্ব প্রতিনিধি,সুনামগঞ্জ

১৫/০৭/২০২৬ ১৯:২৭:০৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

এক হাতে স্বামী হারানোর গভীর শোকের পাথর, অন্য হাতে শক্ত করে ধরা নৌকার বৈঠা। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ৩ নং বাহাড়া ইউনিয়নের রঘুনাথপুর খেয়াঘাটে দাঁড়ালে প্রতিদিন চোখে পড়ে এক লড়াকু মায়ের জীবনসংগ্রামের নির্মম ও জীবন্ত ছবি। তিনি সুমিত্রা রানী দাস। প্রায় সাত বছর আগে এক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান স্বামী সুখেন দাস। কোনো পুত্রসন্তান না থাকা এবং উপার্জনের বিকল্প কোনো পথ না পেয়ে ভেঙে পড়া সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হন সুমিত্রা নিজেই।


​টানা সাত বছর ধরে রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-তুফান উপেক্ষা করে নদীর বুকে দাঁড় টেনে যাচ্ছেন তিনি। লক্ষ্য একটাই তিন মেয়ের মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দেওয়া এবং তাদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। তবে দূর থেকে যে সংগ্রামকে মানুষ 'সাহসিকতা' বলে প্রশংসা করছে, তার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে প্রতিদিনের ক্ষুধা, ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা এবং তীব্র অভাবের এক নিষ্ঠুর বাস্তব চিত্র। আজ সুমিত্রা রানীর এই লড়াই শুধু মৌখিক সহানুভূতির নয়, বরং রাষ্ট্র, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের জরুরি ও কার্যকর আর্থিক সহযোগিতার দাবি রাখে।


​বয়সের ভার আর হাড়ভাঙা খাটুনিতে সুমিত্রা রানীর শরীরে এখন নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। তীব্র কোমরের ব্যথা ও শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে শুরু করে রাত ৯টা পর্যন্ত নিরলসভাবে যাত্রী পারাপার করেন তিনি। প্রচণ্ড রোদ কিংবা কালবৈশাখীর ঝড় কোনো কিছুই তার যাত্রাবিরতির কারণ হতে পারে না। কারণ, একদিন নৌকা না চললে পরিবারের চুলায় হাঁড়ি চড়ে না।


​খেয়া পারাপারের এই নৌকাটি ক্রয়ের টাকা এবং প্রতিনিয়ত চিকিৎসার খরচ ও সংসার চালাতে গিয়ে সুমিত্রা এখন স্থানীয়ভাবে চড়া সুদে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। প্রতিদিনের আয়ের একটা বড় অংশ চলে যায় ঋণের কিস্তি শোধ করতে। ফলে হাড়ভাঙা খাটুনির পরও দিনশেষে তার হাত খালিই থাকে।


​সরকারি সহায়তায় একটি ঘর ও থাকার জন্য সামান্য একটু জায়গা পেয়েছেন সুমিত্রা। কিন্তু পেটের ক্ষিদে মেটানোর স্থায়ী কোনো সমাধান এখনো মেলেনি। অশ্রুসজল চোখে সুমিত্রা রানী বলেন, সরকার আমাকে একটি ঘর ও থাকার জন্য জায়গা দিয়েছে, সেজন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ। কিন্তু শুধু থাকার ঘর থাকলেই তো পেট ভরে না, ঘরে খাবারও থাকতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে এই অসুস্থ শরীর নিয়ে রাত-দিন খেয়া পারাপার করি। ঝড়-বৃষ্টি হলে যখন নদী উত্তাল থাকে, তখন নৌকা চালাতে পারি না। সেই দুর্যোগের দিনগুলোতে আমার পুরো পরিবারকে অভুক্ত কাটাতে হয়। আমি কারও করুণা চাই না, শুধু ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেয়ে সম্মানের সাথে মেয়েদের নিয়ে বেঁচে থাকার একটুখানি নিশ্চয়তা চাই।


​সুমিত্রা রানীর পরিবারে বর্তমানে সদস্য সংখ্যা পাঁচজন। তার তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়েটির বিয়ে দিলেও পারিবারিক সংকটের কারণে তিনিও এখন মায়ের আশ্রয়ে। মেঝো মেয়ে অত্যন্ত মেধাবী, যিনি বর্তমানে সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করছেন। আর ছোট মেয়ে শাল্লা সদরের শহীদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। সুমিত্রার স্বপ্ন ছিল মেয়েদের পড়াশোনা করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবেন। কিন্তু বর্তমানে তার নিজের চিকিৎসা খরচ এবং নৌকার আয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে তাদের শিক্ষা জীবন।


​স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, একজন অসহায় নারী হয়েও সুমিত্রা যেভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে বৈঠা হাতে পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়। কিন্তু শুধু মুখের প্রশংসায় এই দরিদ্র পরিবারের অভাব মিটবে না, তাদের প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সহায়তা।


​এই বিষয়ে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সুমিত্রা রানী দাসকে যথাসাধ্য সহায়তা করে আসছি এবং ভবিষ্যতে সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা এলে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। উনার শারীরিক অবস্থা আসলেই আশঙ্কাজনক। আমরা উনার সুচিকিৎসার জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তা এবং উনার মেয়েদের শিক্ষা সহায়তার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমলে নিচ্ছি। খুব দ্রুতই এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


​একটি স্বাবলম্বী হওয়ার স্থায়ী মাধ্যম, সুচিকিৎসার ব্যবস্থা এবং মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের দানশীল ও বিত্তবান মানুষের একটুখানি সহমর্মিতাই পারে এই সংগ্রামী মায়ের মুখে স্থায়ী স্বস্তির হাসি ফিরিয়ে দিতে।


প্রীতম দাস / আর আর

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad