গোয়াইনঘাটে বালুবাহী নৌকার টোল আদায়ে মহাউৎসব

রাজস্ব গিলে খাচ্ছে ‘ইজারা সিন্ডিকেট’

গোয়াইনঘাটে বালুবাহী নৌকার টোল আদায়ে মহাউৎসব

তাহির আহমদ

১৫/০৭/২০২৬ ২৩:৩৪:৫০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

আইন আর নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলায় চলছে সরকারি রাজস্ব লুটের এক মরণখেলা। উপজেলার নদীপথগুলো এখন পরিণত হয়েছে কতিপয় ইউপি চেয়ারম্যান আর প্রভাবশালী ইজারাদারদের ‘ব্যক্তিগত পকেট’ ভারী করার অভয়ারণ্যে। বালুবাহী নৌকা থেকে টোল আদায়ের নামে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা পকেটস্থ করা হলেও, তার ছিটেফোঁটাও জমছে না সরকারি কোষাগারে। ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে ঢাল বানিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে কোটি কোটি টাকার এই রাজস্ব আত্মসাতের ঘটনায় বুধবার (১৫ জুলাই, ২০২৬) সিলেটের জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন মো. আবুল হোসেন নামের এক ব্যক্তি।


অভিযোগের তীর মূলত উপজেলার একাধিক ইউনিয়ন পরিষদের দিকে, যারা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইজারার নামে একচেটিয়া লুটপাটের লাইসেন্স বিলি করেছে।

হরিলুটের খতিয়ান: কাগজের ইজারা বনাম মাঠের দাপট


অনুসন্ধানে এবং অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার একাধিক ইউনিয়ন পরিষদ প্রতিটি বালুবাহী নৌকা থেকে ৭৫ পয়সা হারে টোল আদায়ের ইজারা দিয়েছে। খাতায়-কলমে এই ইজারার অঙ্ক লাখ লাখ টাকা দেখানো হলেও, মাঠপর্যায়ে টোল আদায়ের নামে চলে মূলত প্রকাশ্য চাঁদাবাজি আর পেশ পেশিশক্তির মহড়া।


তালিকায় থাকা ইজারা ও ইজারাদারদের চিত্র অনুযায়ী ১নং রুস্তমপুর ইউনিয়নের ইজারাদার আলী আমজদ (১২ লাখ ৬১ হাজার টাকা)। ২নং পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের ইজারাদার এনাম উদ্দিন (৩০ লাখ টাকা)। গোয়াইনঘাট সদর ইউনিয়নের ইজারাদার মদরিস আলী (১৭ লাখ টাকা) এবং ১৩নং বিছনাকান্দি ইউনিয়নের ইজারাদার আবুল কালাম (১৩ লাখ টাকা)।


অভিযোগের সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর থাবাটি পড়েছে ২নং পশ্চিম জাফলং ইউনিয়ন পরিষদের ওপর। গত ২০২৫ অর্থবছরে এই ইউনিয়নে আবুল হোসেন নামের এক ব্যক্তি ২০ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন। নদীপথে দাপট খাটিয়ে নিয়মিত বালুবাহী নৌকা থেকে কোটি কোটি টাকা টোল উসুল করা হলেও, সেই আদায়কৃত বিপুল অর্থের সিংহভাগই ইউনিয়ন পরিষদের তহবিলে জমা দেওয়া হয়নি! বছরের পর বছর ধরে চলা এই প্রকাশ্য জালিয়াতি কেবল সরকারি অর্থ আত্মসাৎ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বুকে এক চরম চপেটাঘাত।


সরকারি বিধান অনুযায়ী, ‘লোকাল গভর্নমেন্ট’ বা ইউনিয়ন পরিষদের টাকা সরাসরি জনগণের আমানত। কিন্তু গোয়াইনঘাটের এই ‘টোল সিন্ডিকেট’ আইনকে নিজেদের হাতের মোয়া বানিয়ে নিয়েছে।


অভিযোগে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ২(১১) ধারা অনুযায়ী টোল-ফি-শুল্ক সম্পূর্ণ ‘কর’-এর আওতাভুক্ত। এবং ৬৬ ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত তফসিল মেনেই কেবল এই ইজারা দেওয়া যায়। এই আদায়কৃত অর্থের পাই-পাই হিসাব পরিষদের তহবিলে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।


তাছাড়া, আদায়কৃত সরকারি অর্থ জমা না দিয়ে তা পকেটস্থ করা দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৬ ধারায় (বিশ্বাসভঙ্গজনিত অপরাধ) এবং ৪২০ ধারায় (প্রতারণা) সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ বিষয়টিও দুর্নীতির চরম বহিঃপ্রকাশ যা সরাসরি ‘Prevention of Corruption Act, 1947’ (দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন)-এর অধীনে মারাত্মক ‘ফৌজদারি অসদাচরণ’ (Criminal Misconduct)-এর শামিল।


এই গোটা হরিলুটের নাটকে সবচেয়ে লজ্জাজনক অধ্যায়টি রচনা করেছেন স্থানীয় প্রশাসনের অভিভাবকেরা। নৌপথে ইউনিয়ন পরিষদগুলো যে আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেদের ইচ্ছেমতো ইজারা বিলি করছে আর কোটি কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে—সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকার ভান করছেন গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী। তিনি অত্যন্ত দায়সারাভাবে জানিয়েছেন, নৌপথে ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক ইজারার বিষয়টি তাঁর জানাই নেই!


প্রশ্ন ওঠে, খোদ উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় নদীপথগুলো দাপুটে সিন্ডিকেটের দখলে চলে গেল, কোটি কোটি টাকার রাজস্ব গায়েব হয়ে গেল, অথচ প্রশাসন নির্বিকার ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল কীভাবে? এই উদাসীনতা কি কেবলই অবহেলা, নাকি এর পেছনেও রয়েছে কোনো অদৃশ্য ভাগবাটোয়ারার গভীর খেলা?


অভিযোগকারী জেলা প্রশাসকের কাছে দাবি জানিয়েছেন, অনতিবিলম্বে গোয়াইনঘাটের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ইজারা প্রক্রিয়া এবং আদায়কৃত অর্থের প্রকৃত হিসাব বের করতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। বিশেষ করে ২নং পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের বিগত বছরের ইজারার টাকা কোথায় গেল, কার পকেটে ঢুকল, তা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বের করতে হবে।


প্রয়োজনে এই বিশাল সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের মহোৎসবের ফাইল যেন সরাসরি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতে সোপর্দ করা হয়। এই প্রভাবশালী ইজারাদার ও তাঁদের মদদদাতা রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না হলে, গোয়াইনঘাটের নদীপথগুলো চিরতরে এই লুটেরা সিন্ডিকেটের করদরাজ্যে পরিণত হবে।

মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad