টাঙ্গুয়ারে হাওরে হাউসবোটে মাদক বাণিজ্য
Led Bottom Ad

সামাজিক মাধ্যমে নিন্দা ও ক্ষোভ

টাঙ্গুয়ারে হাওরে হাউসবোটে মাদক বাণিজ্য

লতিফুর রহমান রাজু. নিজস্ব প্রতিবেদক, সুনামগঞ্জ

১০/০৮/২০২৫ ১৯:১৭:১৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রতিদিন শত শত পর্যটকদের সমাগম ঘটে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে। অন্তত চর শতাধিক হাউসবোট সুনামগঞ্জ শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে এবং নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকেও হাউসবোট গুলো পর্যটকদের নিয়ে আসে। বিশেষ করে শুক্র,শনি এবং ছুটির দিনে অতিরিক্ত পর্যটকদের সমাগম ঘটে। কেউ আসেন পরিবার পরিজন নিয়ে,কেউ আসেন বন্ধু বান্ধব নিয়ে, শিক্ষা সফরে আসেন। আবার নাটক, সিনেমার অভিনেতা, অভিনেত্রী, মডেলরা ও আসেন।  একদিন একরাতের প্যাকেজে রাত্রিযাপন টাঙ্গুয়ার হাওর বা আশপাশের কোন জায়গাতে করেন।  কিন্ত এই সুযোগে এক শ্রেণির পর্যটকদের বিভিন্ন ধরনের মাদক দ্রব্যের প্রতি জোকঁ থাকায় এবং তাদের চাহিদা থাকায় টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রীক মাদকের রমরমা বাণিজ্য দেখা দিয়েছে। কিছু কিছু পর্যটক নানা কৌশলে সাথে করেই মদ সহ বিভিন্ন মাদক দ্রব্যে নিয়ে আসেন এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। আবার পর্যটকদের চাহিদার কারণে কিছু মাদক কারবারিগণ হাউসবোট গুলোতে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে। এই কাজে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের ব্যবহার করা হচ্ছে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা হাউসবোট গুলোতে গিয়ে জিজ্ঞেস করে মাল লাগবে কি না, লাল পানি লাগবে কি না। বাবা লাগবে কি না ইত্যাদি। আবার ছোট ছোট নৌকা নিয়ে হাউসবোটের পর্যটকদের টাঙ্গুয়ার হাওরের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়ানোর ফাঁকে মাদক দ্রব্যের কেনা বেচা চলে অবাধে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন একটি বিষয় ভাইরাল হলে সবার নজরে আসে। ঢাকা থেকে আগত সুন্দরী রুমী নামে এক মডেল ছোট একটি নৌকায় চড়ে হাতে বিদেশী মদের বোতল নিয়ে অশালীন পোষাক পড়ে নানা অঙ্গ ভঙ্গি করে তার নিজ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে  বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ এর নিন্দা জানান। আবার কোন কোন সময় কোন হাউসবোটের ছাদে কিংবা ভেতরে বসে বন্ধু বান্ধব মিলে মদের আসর বসানোর ভিডিও মাঝে মাঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায়। এতে বিপাকে পড়ছেন হাউসবোট, মালিক, চালকরা।



স্থানীয় ও হাউসবোট চালকদের সূত্রে জানা যায়, উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরসহ সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন পর্যটনস্পটে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ঘুরতে আসেন। আর এসব পর্যটনস্পটে ঘুরতে ব্যবহার করেন হাউসবোট। হাউসবোট সাধারণত সুনামগঞ্জ জেলা শহর বা তাহিরপুর উপজেলা সদর থেকে পর্যটক নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর হয়ে বিকেলে নিলাদ্রী লেক এবং পরের দিন জাদুকাটা নদীতে পৌঁছায়। জাদুকাটা নদীর বারেকটিলা, শিমুল বাগান বা লাউড়েরগড় পাড়ে হাউসবোট রাখা হয়।


হাউসবোট টাঙ্গুয়ার হাওর, নিলাদ্রী লেক, যাদুকাটা নদীর পাড়ে (লাউড়েরগড়, শিমুল বাগান ও বারেকটিলা) পৌঁছা মাত্রই স্থানীয় ১০-১২ বছর বয়সী ছেলেরা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদের বোতল নিয়ে হাউসবোটে ওঠে বিক্রি করার জন্য।


শুক্রবার (১ আগস্ট) দুপুরে জাদুকাটা নদীর লাউড়েরগড় পাড়ে কয়েকজন ১০-১২ বছর বয়সের ছেলে বিদেশি মদ নিয়ে একটি হাউসবোটে এলে ছবি ও ভিডিও করায় পালিয়ে যায় তারা।


ভিডিও ধারণকারী পর্যটকবাহী হাউসবোট ম্যানেজার তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের মধ্য তাহিরপুর গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন শাওন বলেন, শুক্রবার দুপুরে আমাদের হাউসবোটটি জাদুকাটা নদীর পাড়ে (লাউড়েরগড়) আসা মাত্র ১০-১২ বছর বয়সের কয়েকটি ছেলে হাউসবোটে ওঠে বিদেশি মদ নিয়ে। পর্যটকদের কাছে এসে বলে ‘মাল লাগবে কি? বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মাল দিতে পারব।’ তখন আমি ভেতর থেকে এসে ছবি তুলি ও ভিডিও করি। পরে ছেলেগুলো হাউসবোট থেকে নেমে যায়।


তরঙ্গ বিলাশ হাউসবোটচালক জানে আলম বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটক নিয়ে এলেই ছোট ছোট ৮-১০টি নৌকা পর্যটকদের ঘুরাতে নিতে আসে। তারা এসে বলে ‘মামা লাল পানি (মদ) লাগবে? লাগলে দিতে পারি। যে কোনো ব্র্যান্ডের দেওয়া যাবে।’


তিনি বলেন, শুধু টাঙ্গুয়ার হাওর নয় বারেকটিলা শিমুল বাগান গেলেও স্থানীয় মদ ব্যবসায়ীদের কারণে বিপাকে পড়তে হয়। পর্যটক ও আমাদের কাছে এসেও বলে মদ লাগবে কি না? আবার হাউসবোট গুলোর কিছু ষ্টাফদের বিরুদ্ধেও এলাকাবাসীর অভিযোগ রয়েছে।


তাহিরপুর নৌ-পর্যটন শিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ রব্বানী বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর, নিলাদ্রী লেক পাড়, বারেকটিলা ও শিমুল বাগান হাউসবোট যাওয়ার পরে মাদক ব্যবসায়ীরা পর্যটকদের মাথা নষ্ট করে দেয়। এমনিতে অনেক পর্যটক মদ খোঁজে কিন্তু হাউসবোটের লোকজন অপারগতা স্বীকার করলেও স্থানীয় মদ ব্যবসায়ীরা এটা আরও সহজ করে দেয়। এখন তারা এই কাজে ছোট ছোট কম বয়সী ছেলেদের ব্যবহার করছে।


তাহিরপুর উপজেলার সংবাদ কর্মী কামাল হোসেন জানান, সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি থাকায় খুব সহজেই বিভিন্ন ধরনের মাদক দ্রব্যে পাওয়া যায়। 

 হাউসবোট মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ আরাফাত হোসেন বলেন, সুনামগঞ্জ জেলার ৯ টি উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী নেত্রকোনা জেলা থেকেও হাউসবোটে পর্যটকদের সমাগম ঘটে। এক শ্রেণির লোকজন বিশেষ করে ব্যাচেলর গণ এসব করে। আমরা হাউসবোট মালিক গণ এসব বন্ধে আপ্রাণ চেষ্টা করছি। ইদানিং কয়েকজন আনসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে ট্যাকেরঘাট। বাইরের হাউসবোট গুলো আমরা চিনি না ,এগুলো প্রশাসন দেখার কথা। 


 এ বিষয়ে  কথা বলতে  তাহিরপুর থানার ওসি এবং তাহিরপুর উপজেলার ইউএনও কে একাধিক বার ফোন দিলে ও রিসিভ না করায় তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সুনামগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মোঃ তোফায়েল আহমেদ জানান, বিষয়টি জানার পর থেকেই আমরা প্রায় প্রতিদিনই অভিযান অব্যাহত রেখেছি। ধরাও হচ্ছে। এসব বন্ধে আরও অভিযান জোরদার করা হবে। 


পর্যটন এলাকাগুলোতে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। তাহিরপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা। এখানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ ঘুরতে আসেন। কিন্তু কিছু অসাধু চক্র মাদক ব্যবসা বা সেবনের মাধ্যমে এই এলাকার পরিবেশ ও পর্যটনের সুনাম নষ্ট করার অপচেষ্টা চালায়। তাদের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি।


মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad