বানিয়াচংয়ে এই দিনে সংবাদকর্মী ও পুলিশসহ প্রাণ হারায় ১০ জন

ফিরে দেখা > ৫ আগষ্ট ২০২৪

বানিয়াচংয়ে এই দিনে সংবাদকর্মী ও পুলিশসহ প্রাণ হারায় ১০ জন

ফয়সল চৌধুরী,হবিগঞ্জ

০৫/০৮/২০২৬ ০৪:৪১:১২

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

৫ আগষ্ট দিনভর পুলিশ ও আওয়ামীলীগের সাথে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় হবিগঞ্জ জেলা বানিয়াচং। এতে ঘটনাস্থলে ৬ জনসহ মোট প্রাণ হারায় ১০ জন। এরমধ্যে শিশু, গণমাধ্যমকর্মী ও পুলিশ রয়েছে। পুড়িয়ে দেওয়া হয় পুরো থানা কমপ্লেক্স। ফলে বন্ধ হয়ে যায় থানার সকল কার্যক্রম। এছাড়াও সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। 

নিহতরা হলেন- বানিয়াচংয়ের যাত্রাপাশা মহল্লার সানু মিয়ার ছেলে হাসান মিয়া (১২), মাঝের মহল্লা গ্রামের আ. নূরের ছেলে আশরাফুল ইসলাম (১৭), পাড়াগাও মহল্লার শমশের মিয়ার ছেলে মোজাক্কির মিয়া (৪০), কামালখানি মহল্লার নয়ন মিয়া (১৮), জাতুকর্নপাড়া মহল্লার আ. রউফের ছেলে তোফাজ্জ্বল (১৮), পূর্ব ঘরপাড় গ্রামের দলাই মিয়ার ছেলে সাদিকুর (৩০) ও চানপুর বন্দেরবাড়ি গ্রামের তাহের মিয়ার ছেলে আকিবুর মিয়ার (২৫), খন্দকার মহল্লার আবুল হোসেনের ছেলে আনাস আহমেদ (১৭),  সাগরদিঘীর পূর্বপাড়ের গণমাধ্যমকর্মী সোহেল আখঞ্জী ও বানিয়াচং থানার এসআই সন্তোষ দাশ চৌধুরী। এরমধ্যে বানিয়াচং থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সন্তোষ ঘোষ ও গণমাধ্যমকর্মী সোহেল আখঞ্জী আন্দোলনকারীদের গণপিটুনিতে নিহত হন। 

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত- - ৪ আগষ্ট ছাত্র-জনতা সরকার পতনের একদফা দাবিতে বানিয়াচং সদরের এলআর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি স্থানীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই ময়েজ উদ্দিন শরীফ রুয়েল এমপির নিদের্শে আওয়ামী লীগ নেতা হায়দারুজ্জামান খান ধন চেয়ারম্যানের মিয়ার নেতৃত্বে প্রায় ৫ শতাধিক নেতাকর্মীরা শহীদ মিনারে স্বশস্ত্র অবস্থান নেয়। খবর পেয়ে সংঘর্ষ এড়াতে ছাত্র-জনতার মিছিলটি শহীদ মিনারে না গিয়ে সাগরদীঘি পূর্ব পাড়ে গিয়ে সমাপ্ত করেন।

পরদিন সোমবার (৫ আগষ্ট) দুপুরে এলআর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে প্রায় ১৫/২০ হাজার  ছাত্র-জনতা শহীদ মিনারে উদ্দেশ্য একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি নতুন বাজার হয়ে শহীদ মিনারে আসলে সেখানে উপস্থিতি আরও বাড়লে। এ সময় ছাত্র- জনতা জানতে পারে হায়দারুজ্জামান খান ধন চেয়ারম্যানসহ যারা রোববারে শহীদ মিনারে স্বশস্ত্র অবস্থান নিয়েছিল তারা থানায় অবস্থান করছে। এ খবর পেয়েই বিক্ষুব্ধ জনতা থানার সামনে দিয়ে যেতে চাইলে স্থানীয় ঈদগা এলাকায় পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বাধা দেয়। এ নিয়ে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকলে পুলিশ রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়তে থাকে। হায়দারুজ্জামান খান ধন চেয়ারম্যান, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি আসাদুজ্জামান খান তুহিন, উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-আব্দুল হালীম সোহেল, রফিকুল ইসলাম চৌধুরী রিপন, মাহমুদ হোসেন মামুনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। গুলিতে ঘটনাস্থলে ৬ জন নিহত হয়।

শিক্ষার্থীদের উপর হামলা ও নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের কয়েকটি গ্রাম থেকে ২৫/৩০ হাজার মানুষ দলবদ্ধ হয়ে থানায় হামলা ও আগুন দেন পাশাপাশি উপজেলার ডাক বাংলোতেও আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ লোকজন। আগুনে থানা ও কোয়ার্টার সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। থানার সামনে রাখা কয়েকটি গাড়িও পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এ সময় স্থানীয় দৈনিক লোকালয় বার্তার সংবাদকর্মী সোহেল আখঞ্জীকে পুলিশ মনে করে পিটিয়ে হত্যা করে জনতা। পরে তারা থানা ঘেরাও করে রাখে। খবর পেয়ে একদল সেনাবাহিনী বানিয়াচং থানায় গিয়ে তাদেরকে উদ্ধারের চেষ্টা করে। কিন্তু ছাত্র-জনতার বাধার মুখে তাদেরকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়। পরে রাত ১২ টা দিকে বর্তমান হুইপ জি কে গউছ ও বর্তমান ডাঃ সাখাওয়াত হোসেন জীবকে  নিয়ে সেনাবাহিনীর আরও একটি বহর বানিয়াচং থানায় যায়। সেখানে দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর রাত ২টার দিকে জনতা এস আই সন্তোষ ঘোষকে ছাড়া অন্য পুলিশদের ছেড়ে দিতে রাজি হয়। সেনাবাহিনী অবরুদ্ধ পুলিশদের নিয়ে বেড়িয়ে আসার সময় এস আই সন্তোষ দাশ চৌধুরী পিঠিয়ে হত্যা করে জনতা। পরে জনতা মৃতদেহটি থানার পাশে একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখে। পরেরদিন দুপুর ২টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল গিয়ে মৃতদেহটি উদ্ধার করে নিয়ে আসে।

উল্লেখ্য, এস আই সন্তোষ দাশ চৌধুরী ছাড়া বাকী ৯জনের হত্যাকান্ডের ঘটনায় একটি মামলা আন্তাজার্তিক অপরাধ ট্রাইবুনালে  চলমান আছে। এছাড়াও ২০২৪ সালের ২২ আগষ্ট সন্তোষ দাশ চৌধুরীকে থানা ঘেরাও করে হত্যার ঘটনায় বানিয়াচং থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু হানিফ বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। এতে ৫ থেকে ৬ হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।


হবিগঞ্জ

ফয়সল চৌধুরী / ডিডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad