বলছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা
লোডশেডিংয়ের আড়ালে পরিকল্পিত ট্রিপল মার্ডার
দীর্ঘদিনের ছক কষে সংঘটিত একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডে কেঁপে উঠেছে সিলেট নগরী। সন্তানেরা প্রবাসে থাকার সুযোগে চার দেয়ালের মাঝে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছিলেন প্রবীণ দম্পতি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দিনদুপুরে লোডশেডিংয়ের সুযোগে ঘটিয়েছে এক ট্রিপল মার্ডার।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে সিলেট নগরের রায়নগর এলাকার মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১১ নম্বর বাসার দোতলা থেকে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের কিশোরী গৃহকর্মীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতরা হলেন— আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এবং তাদের গৃহকর্মী তাহমিনা (১৫)।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। নিহত দম্পতির চার সন্তানের সকলেই দেশের বাইরে (দুই ছেলে লন্ডনে ও দুই ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে) অবস্থান করছেন। বাসায় প্রবীণ দম্পতি ও গৃহকর্মীরা ছাড়া কেউ না থাকার বিষয়টি ঘাতক চক্রটি আগে থেকেই নিশ্চিত হয়ে নিখুঁত পরিকল্পনা ফাঁদে।
সিসিটিভি এড়াতে লোডশেডিংয়ের সুযোগ
পুরো রায়নগর এলাকা ও ওই ভবনটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকা সত্ত্বেও কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ওই এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। তদন্তকারীদের প্রবল ধারণা, এই লোডশেডিংয়ের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে ঘাতকেরা আগে থেকেই জানত এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এই সময়টিকেই বেছে নেয়। সিসিটিভি অকার্যকর থাকার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধ সংঘটিত করে তারা চম্পট দেয়।
পুলিশ জানায়, বাসার পৃথক দুটি কক্ষ থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনার রক্তস্নাত দেহ এক কক্ষে এবং অন্য একটি কক্ষে আব্দুস সাত্তারের মরদেহ পড়েছিল। তিনজনকেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। দরজার নিচ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে দেখে প্রতিবেশীরা খবর দিলে পুলিশ গিয়ে দরজা খুলে তিনজনের লাশ দেখতে পায়।
তদন্তে সাবেক ভাড়াটের বিরোধ ও জমির দলিল
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, হত্যার কারণ হিসেবে ডাকাতি, সম্পত্তিগত বিরোধ নাকি পূর্বশত্রুতা কাজ করেছে— তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, বাসার ওয়ারড্রব ও আলমারি খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল উদ্ধারের পর সেটি তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নিহত দম্পতির গাড়িচালক ও ভাগ্নে মুন্না মিয়ার সূত্রে জানা গেছে, নিচতলার এক সাবেক ভাড়াটের সঙ্গে আব্দুস সাত্তারের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল। জায়গা-জমির ব্যবসা করা ওই ভাড়াটে বাসা না ছাড়ায় মহল্লার কমিটির মাধ্যমে বিচারে চাপ সৃষ্টি করে তাকে গত মাসে বাসা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। এই বিরোধের জের কিংবা কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ, পিবিআই ও সিআইডির বিশেষ দল।
একটি স্বপ্নের অকালমৃত্যু
এদিকে, পরিবারের আর্থিক হাল ধরতে গত ঈদুল আজহার পর এই বাসায় কাজ শুরু করেছিল ১৫ বছরের কিশোরী তাহমিনা। সুনামগঞ্জের ছাতক-দোয়ারাবাজার এলাকার দিনমজুর আপ্তাব মিয়ার পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় তাহমিনা কাজ করতে এসে এভাবে লাশে পরিণত হবে, তা কল্পনাও করতে পারেনি তার পরিবার। ঘটনার খবর ছড়াতেই জল্লারপাড় কলোনির বাসায় নেমে আসে মাতম।
সিলেট কোতোয়ালি থানার ওসি খান মোহাম্মদ মইনুল জাকির বলেন, "এটি একটি সুপরিকল্পিত অপরাধ। ঘটনার পর থেকে পলাতক অপর গৃহকর্মীর সন্ধানসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।"
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: