সিলেটে ত্রিভুজ রহস্য
পুলিশ বলছে ‘প্রেমের বলি’, এজাহারে উঠে এলো ‘জমি বিরোধ’!
সিলেট নগরের রায়নগরে প্রবীণ দম্পতি ও গৃহকর্মীকে নৃশংস গলা কেটে হত্যার ঘটনাটি ক্রমেই এক জটিল রহস্যের দিকে মোড় নিচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের পরদিন পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ‘প্রেমঘটিত ক্ষোভ ও গৃহকর্মীকে কেন্দ্র করে খুনে’র দাবি করা হলেও, নিহতের পরিবারের পক্ষে দায়ের করা এজাহারে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভয়ানক চিত্র—দীর্ঘদিনের জমি বিরোধ ও ভাড়াটে খুনি দিয়ে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
নিহত আব্দুস সাত্তারের যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাতে সিলেট কোতোয়ালি থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯৭ সাল থেকে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির লিজ নেওয়া জমিতে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন তার বাবা। তবে ২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম সমিতির ৮০ শতক জমি নিজের নামে দলিল করে মালিকানা দাবি করলে দ্বন্দ্বে জড়ায় দুই পক্ষ। এ নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ বিচারাধীন রয়েছে।
সেলিনার দাবি, মামলা প্রত্যাহারের জন্য তার পরিবারকে দীর্ঘদিন ধরে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এমনকি গত ২৮ জুলাই আদালতে সেলিনার বাবার আইনজীবীকে এবং ৩০ জুলাই তার বাবাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়। সেলিনার গুরুতর অভিযোগ—স্বত্ব মামলার দলিল ও বিরোধীয় জমি রক্ষার্থেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনি এনে তার বাবা, মা ও গৃহকর্মীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় বাসা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, জিডির কপি ও দলিলাদিও লুটে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ঘটনার দিন বিকেলেই সন্দেহভাজন হিসেবে রায়নগর এলাকার বাবুল মিয়াকে (৪০) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, বাসায় রং করার সুবাদে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের পরিচয় হয়। তাহমিনার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বাবুল প্রথমে তাকে এবং পরে দম্পতিকে হত্যা করেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন।
তবে নিহতের মেয়ের দায়ের করা অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত বাবুল মিয়ার কোনো নামই উল্লেখ করা হয়নি। একজন সাধারণ রংমিস্ত্রি একাই কীভাবে পুরো পরিবারকে এভাবে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করল এবং একই সাথে গুরুত্বপূর্ণ সব দলিলপত্র গায়েব হয়ে গেল—এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এজাহারে বাবুলের নাম না থাকা প্রসঙ্গে সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মো. মঈনুল জাকির জানান, "অভিযোগে জমি বিরোধের বিষয়ে আমরা একটি লিখিত দাবি পেয়েছি। আবার বাবুল নিজেও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। তাই জমি বিরোধ এবং বাবুলের সম্পৃক্ততা—দুটি দিকই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।"
হত্যাকাণ্ডটি কি সত্যিই প্রেমের টানাপোড়েনে ঘটা কোনো একক অপরাধ, নাকি জমি দখলের মাস্টারপ্ল্যান ঢাকতে ভাড়াটে খুনির ছক? তদন্তের অগ্রগতিই বলে দেবে ঘটনার আসল রূপ।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: