নিখোঁজ ১৮
ভূমধ্যসাগরে ফের নৌকাডুবি: বাংলাদেশী ১১ মৃত্যুর তালিকায় সুনামগঞ্জের ৭ জন
উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে আবারও এক করুণ ট্রাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। লিবিয়া উপকূল থেকে নৌকায় গ্রিসের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়ে সাগরে ইঞ্জিন বিকল হয়ে করুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী। এছাড়া সুনামগঞ্জ জেলার ৭ জনসহ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ১৮ জন। এ ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া কয়েকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মিশরের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ইতিপূর্বেও ভূমধ্যসাগরকে কেন্দ্র করে একাধিক প্রাণঘাতী ট্রাজেডির সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ। অবৈধ ও বিপজ্জনক এই 'গেম ঘর' বা ট্রাভেল রুটে বছরের পর বছর তরুণদের অকাল সলিলসমাধি ঘটলেও দালালের খপ্পরে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পাড়ি থামেনি। এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি যেন সেই পুরনো বেদনার দাবানলকে নতুন করে উসকে দিল।
মিশরের 'মারসা মাতরুহ' হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল করিম এক ফেসবুক লাইভে ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দেন। তিনি জানান, গত ৩ আগস্ট রাতে লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে একটি কাঠের নৌকায় মোট ৪২ জন যাত্রী নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে রওয়ানা দেয় দালালচক্র। যাত্রীদের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি এবং ৪ জন সুদানির নাগরিক ছিলেন।
যাত্রার একপর্যায়ে গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছালে নৌকাটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। টানা ১১ দিন সাগরে দিগ্বিদিক ভাসতে থাকেন তারা। একসময় খাবার ও পানীয় জলের সব মজুত সাগরে ভেসে যায়। অনাহার, তৃষ্ণা ও প্রখর রোদে চোখের সামনে ১১ জন বাংলাদেশি মারা যান। উপায়ান্তর না পেয়ে সহযাত্রীদের লাশ সাগরেই ভাসিয়ে দিতে হয়। দীর্ঘদিন বিষাক্ত লবণাক্ত পানিতে ভেসে থাকার কারণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের শরীরে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে।
এক নজরে দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান: মোট যাত্রী: ৪২ জন (৩৮ বাংলাদেশি, ৪ সুদানি)। নিহত: ১১ জন বাংলাদেশি (মরদেহ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে)। নিখোঁজ: ১৮ জন বাংলাদেশি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন: বেঁচে যাওয়া কয়েকজন মুমূর্ষু যাত্রী
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলায়। স্বজন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সূত্রে জানা গেছে, নিখোঁজ ১৮ জনের মধ্যে ৭ জনই এই উপজেলার। এখন পর্যন্ত ৪ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন, মামুন খান (চিকার কান্দি গ্রাম, পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন), এনাম খান (চিকার কান্দি গ্রাম, পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন), রিপন মিয়া (চিকার কান্দি গ্রাম, পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন), রিফাত/রিদয় (শত্রুমর্দন গ্রাম, পিতা: রিন্টু পাল)।
নিখোঁজ স্বজনদের বাড়িতে এখন শোকের মাতম চলছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আব্দুল করিম আকুতি জানিয়ে বলেন, আমাদের বাঁচান, আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিল্লোল চাকমা জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তারা অবহিত হয়েছেন এবং নিখোঁজদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও সার্বিক খোঁজখবর নিচ্ছেন।
নীরব চাকলাদার/ডিডি
মন্তব্য করুন: