৪৮ কোটি টাকার সড়ক সংস্কারেও কমেনি দুর্ভোগ: ভোগান্তি দুই উপজেলার
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর ও সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার সঙ্গে সিলেট বিভাগীয় শহর ও রাজধানী ঢাকার সড়কপথে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম জগন্নাথপুর-বিশ্বনাথ-রশিদপুর আঞ্চলিক সড়ক। জনগুরুত্বপূর্ণ এই ২৬ কিলোমিটার সড়কের বর্তমান অবস্থা দেখলেই গা শিউরে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মাত্র ৩ বছর আগে সংস্কার করা সড়কের বেহাল চেহারা প্রমাণ করে কী পরিমাণ লুটপাট চালানো হয়েছে সে সময় পাঠানো বরাদ্দ থেকে।
জনগুরুত্বপূর্ণ ২৯ কিলোমিটার এই সড়কের ২৬ কিলোমিটারজুড়ে শুধুই খানাখন্দ আর ভাঙা অংশ। দেখে বোঝার উপায় নেই ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মাত্র ৩ বছর আগে এই সড়ক সংস্কার করা হয়েছে। টেকসই সংস্কারের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাটের অভিযোগ তুলেছেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা।
দাপ্তরিক তথ্য অনুসারে, ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই আঞ্চলিক সড়কের জগন্নাথপুর পৌর পয়েন্ট থেকে রশিদপুর পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার অংশ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন। দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙা অংশ আর খানাখন্দে ভরা সড়কে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দুই উপজেলার বাসিন্দারা।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই সড়কের এক উপজেলার অংশ ভালো থাকলে অন্য উপজেলার অংশ ভাঙাচোরা অবস্থায় থাকে। এই দুর্ভোগ থেকে নিষ্কৃতি পেতে ২০১৮ সালে সড়কটি এলজিইডি থেকে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরে হস্তান্তরে জোরালো দাবি ওঠে। পরে সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের হস্তক্ষেপে এলজিইডি সড়কটি মানসম্মতভাবে করার অঙ্গীকার দিয়ে নিজেদের অধীনেই রাখে।
সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে ২৬ কিলোমিটার অংশের জন্য ৪৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় (২০ শতাংশ অতিরিক্ত দরে)। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে কাজ পান দুই ঠিকাদার-জগন্নাথপুরের ১৩ কিলোমিটার অংশের কাজ ২৫ কোটি ৮ লাখ টাকা নিজেদের ভাগে নেয় হামীম সালেহ জেভি। বিশ্বনাথ অংশের ১৩ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকার কাজ পায় শাওন এন্টারপ্রাইজ।
অভিযোগ রয়েছে, কাজের শুরুতেই পুরোনো পাথর তুলে বালু ও ইটের খোয়া মিশিয়ে কার্পেটিং করা হয়। সেই সময়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে ক্ষোভপ্রকাশ করা হলেও এলজিইডি কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ঠিকাদারের পক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে ২০২৩ সালে কাজ শেষ হতে না হতেই ফের সড়কের বিভিন্ন স্থান ভাঙতে শুরু করে। ইতোমধ্যে আরও প্রায় ৮০ লাখ টাকা (উভয় অংশে ৪০ লাখ টাকা করে) জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের নামে ব্যয় করা হলেও সড়কের কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
জগন্নাথপুর বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, জরুরি কাজে সিলেট যেতে হলে এই ভাঙাচোরা সড়ক ব্যবহার করতে হয়। এতে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ে। বৃদ্ধ ও রোগীদের অবস্থা নাজুক হয়ে যায়।
জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি নিজামুল করিম আক্ষেপ করে বলেন, লুটপাটের স্বার্থেই এলজিইডি সড়কটি নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছিল। বাসচালকরা এখন আর এই সড়ক দিয়ে গাড়ি চালাতে চান না।
বিশ্বনাথ যানবাহন মালিক-শ্রমিকনেতা নজরুল ইসলাম হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, দ্রুত সড়ক সংস্কার করা না হলে তারা কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবেন।
অন্যদিকে, জগন্নাথপুর উপজেলা নাগরিক অধিকার ফোরামের আহবায়ক এম এ কাদির আঞ্চলিক এই সড়কটিকে দ্রুত সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরে হস্তান্তরের দাবি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে এলজিইডি সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন দাবি করেন কাজে অনিয়ম হয়নি। তবে সিলেটের এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন খান জানান, তিন বছরের মাথায় সড়কটি কেন ভেঙে গেল, তা দেখা হবে।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: