আঁধার ঘরে আলোর বাতিঘর তাহিরপুরের জনতা উচ্চ বিদ্যালয়
Led Bottom Ad

আঁধার ঘরে আলোর বাতিঘর তাহিরপুরের জনতা উচ্চ বিদ্যালয়

শামছুল আলম আখঞ্জী,তাহিরপুর প্রতিনিধি

১৩/০৯/২০২৫ ১৩:৩০:০০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

তাহিরপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি বিদ্যাপীটের নাম জনতা উচ্চ বিদ্যালয়। উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নে অবস্থিত এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালে। প্রতিষ্ঠার তিন দশকে আজ বিদ্যালয়টি গৌরব,সম্মান আর ঐতিহ্যের স্বাক্ষ্য বহন করে চলছে। ৩৬ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই বিদ্যালয় আজ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পদভারে পরিপূর্ণ। এখন বিদ্যালয়টি আলো ছড়াচ্ছে উপজেলার সর্বত্র। অবহেলিত একটি অঞ্চলে স্থাপিত এই বিদ্যালয় থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা এখন দেশ-বিদেশে সুনামের সাথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করছেন। ফলে একটি অঞ্চলকে অন্ধকার মুক্ত করণের অবদান হিসেবে এই বিদ্যায়টিকে বলা হয় আধাঁর ঘরের বাতিঘর। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের (সাবেক) চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম। 


উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের দলগাওঁ গ্রামের পূর্ব দিকে ২.২৭একর জমির উপর দাড়িয়ে আছে এই বিদ্যাপীঠ। যাঁর আলোকরশ্মি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে। ১৯৮৯ সালে ৩৬ শিক্ষার্থী নিয়ে বিদ্যালয়টির পদযাত্রা। বর্তমানে ৬৮০জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। 

  

স্থানীয়রা জানান, উত্তর শ্রীপুরে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্থানীয় এলাকাবাসীর উদ্যোগে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১২/১/৮৯ইং সনের সকাল ১০টার সময়

অনুষ্ঠিত সভায় (প্রয়াত) বদর উদ্দিন তালুকদার প্রস্তাব করেন তখনকার ইউপি চেয়ারম্যান নূরুল ইসলামকে সভাপতি ও বিশেষ অতিথি চানফর আলী সাহেবকে আসন গ্রহণ করা জন্য অনুরোধ জানান। প্রস্তাবকে সমর্থন করেন (অবঃ প্রাপ্ত) প্রধান শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা উস্তার আলী আখঞ্জী। সভা থেকে বিদ্যালয়ের নাম করণের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়, আজির উদ্দিন (মেম্বার) জহুরুল হক (মেম্বার) আলী আজগর আখঞ্জী, ও মোদাচ্ছির আলম সুবলকে। এরই ধারাবাহিকতায়  প্রথমে জনতা নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয় নাম গৃহীত হয়। এছাড়াও প্রতিষ্ঠা লগ্নে যাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়, আর্থিক ও সার্বিক সহযোগিতায় রয়েছেন, সেই সকল সুধীজনদের নাম প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ আজও, তাঁরা হলেন :- সেই সময়ের, উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ এর প্রতিনিধি:  আব্দুল হক,আব্দুল হান্নান, রাজধর মিয়া,সুধাংশু পাল,,মনমোহন পাল, জহুরুল হক,  হাছান আলী, ফালু মিয়া ,আজির উদ্দিনসহ সকল ইউপি সদস্য গণ। সিলেট শিক্ষা বোর্ড এর পরিক্ষা নিয়ন্ত্রক (অবঃ প্রাঃ) প্রফেসার অনুরুন চন্দ্র পাল, তরং গ্রামের গিয়াস উদ্দিন তালুকদার (মেম্বার),সুলেমান তালুকদার, আব্দুল লতিফ, মওলানা মজিবুর রহমান আখঞ্জী, তেলীগাও গ্রামের শ্রী রনজিত পাল (রন) মেম্বার, শ্রী সন্দন চন্দ্র পাল, নিকোঞ্জন চন্দ্র পাল, রবীন্দ্র চন্দ্র পাল, শ্রী সন্দন চন্দ্র পাল,রাকেশ পাল,নগর চন্দ্র পাল (শ্রীপুর বাজার)র আব্দুর রহিম, মনোরঞ্জন পাল,উমেশ চন্দ্র পাল, সামসু মিয়া, (শ্রীপুর) নয়াবন্দ গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস, আব্দুল জলিল, আঃ ওয়াহাব, ডাঃ আঃ কাইয়ুম, তোলা মিয়া,শ্রী বিকেশ রঞ্জন পাল, ছিলানী তাহিরপুর গ্রামের আঃ আজিদ (সাবেক) ইউপি সদস্য,  মুজরাই গ্রামের শ্রী নির্মল চন্দ্র দাস, মন্দিয়াতা গ্রামের মোঃ আবাছ আলী, কামালপুর গ্রামের হারিছ উদ্দিন, নূর উদ্দিন, মদনপুর গ্রামের দিলীপ চন্দ্র পাল, শিবরামপুর গ্রামের ময়না মিয়া, মোঃ তোতা মিয়া, মোঃ ইসলাম উদ্দিন, মোঃ মনির উদ্দিন,বেতাগড়া গ্রামের রহিছ মিয়া,খালা শ্রীপুর গ্রামের মোক্তাদির আহমেদ, গোলকপুর গ্রামের সিজিল আহমেদ, জামালপুর গ্রামের শ্রী বকুল চন্দ্র পাল, জয়পুর গ্রামের গিয়াস উদ্দিন,মাটিয়ান গ্রামের আঃ রশিদসহ নাম না জানা ব্যক্তিবর্গের সহযোগীতায়, একসময় অন্ধকারে ডুবে থাকা, উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার আলো। ইতিহাস একদিন তাঁকে স্মরণ করবে আলোর ফেরিওয়ালা হিসেবে।


আজ প্রতিটি গ্রাম— তরং, শিবরামপুর, বেতাগড়, মাটিয়ান, নয়াবন্দ, শ্রীপুর, খালাগাঁও, তেলীগাঁও, বানিয়াগাঁও, জামালপুর, ভোরাগাট, গোলকপুর, মদনপুর, মন্দিয়াতা, ছিলানী, তাহিরপুর সদর, জয়পুর ও গোলাবাড়ি— উচ্চ শিক্ষার ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত। এই অঞ্চল থেকে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে, কেউ কেউ আবার বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে উত্তীর্ণ হয়ে দেশের সেবায় নিয়োজিত। এ সাফল্যের পেছনে অন্যতম অনুপ্রেরণার উল্লেখযোগ্য নাম— নূরুল ইসলাম।


জানা যায়, প্রতিষ্ঠার শুরুতে ‘আলোর বাতিঘর’ হিসেবে খ্যাত এ প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার পেছনে এলাকাবাসীর অনেক ত্যাগ ও অবদান রয়েছে। বিশেষ করে এলাকার সচেতন মহলের কিছু ব্যক্তি বিনা বেতনে শিক্ষকতা করেছেন—তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: আলী আজগর (বিডিআর), প্রয়াত বদর উদ্দিন তালুকদার, মওলানা মজিবুর রহমান আখঞ্জী,  প্রয়াত আব্দুল কাইয়ুম (পল্লী চিকিৎসক), মৌলভী আশ্রাফ আলী আখঞ্জী এবং হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক সুরেন্দ্র দাস।  


প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এই ‘আলোর বাতিঘর’ গড়ে তুলতে যিনি যুবণ ও শ্রম বিসর্জন দিয়ে নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন, তিনি হলেন প্রধান শিক্ষক মোদ্দাছিল আলম সুবল। প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করাতে,মামলা হামলার শিকার হয়েছেন। তাঁর এই অবদান ও আত্মত্যাগ সত্যিই অতুলনীয়।


এই বিদ্যাপীঠের সাবেক শিক্ষার্থী,সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ এর (পদার্থ বিজ্ঞান)'র প্রভাষক তানবীর আখঞ্জী বলেন, অজপাড়াগাঁয়ের অন্ধকারে যখন শিক্ষার আলো ম্লান ছিল, তখন এক মহৎ প্রাণ তার স্বপ্ন, ত্যাগ আর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর সেই মহান উদ্যোগে আজ অজ্ঞতার আঁধার ভেদ করে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি সেই দূরদর্শী প্রতিষ্ঠাতাকে, যিনি আমাদের জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করেছেন। তাঁর এই অবদান কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং গ্রামীণ সমাজের ভাগ্যগঠনের এক অনন্য অধ্যায়। আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করি—তিনি যেন আমাদের এই প্রিয় প্রতিষ্ঠাতাকে সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘ জীবন ও পরম কল্যাণ দান করেন।


নূরুল ইসলাম বলেন,,সেই সময় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা ছিল ব্যয়বহুল ও অনেকের কাছে এক ধরনের বিলাসিতা, যা সবার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তখন আমার মনে একটি ইচ্ছা জন্ম নেয়—এলাকার কল্যাণে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব। সেই চিন্তা থেকেই আমি এগিয়ে যাই।  সুধীজনদের সহযোগিতায় অজয়পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় এলাকার প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আজ সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করছে। তাদের এই সাফল্য দেখে আমি আনন্দ ও গর্ব অনুভব করি।

এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad