রইদরাজা গানের রাজা বাউলশিল্পী শফিকুন্নূর
ছোটোবেলা যেসব বাক্য শুনে-শুনে, বলে-বলে বড় হয়েছি। যেমন- "রইদ রাজারে তুই রইদ তুইল্ল্যা দে,পূবের বাড়ির সুন্দর খইন্ন্যা ছালো তুইল্ল্যা দে!" শীতকালে হিমকুয়াশায় ভিজে তরতর কাঁপতে কাঁপতে মক্তবে যেতাম। মক্তবপাঠ শেষ করে,সকালের নাস্তা কখনও 'চুনজাউ' (চাউল ও চুনের পানি সহযোগে একধরণের পাতলা খিঁচুরি) অথবা মরচাগুড় দিয়ে আটারপিঠা(আটা দিয়ে যে রুটি বানানো হত) খেয়ে বাড়ির উঠানে মিষ্টিরোদ পোহাতাম। 'চুনজাউ' বা যেকোনও পাতলা খিঁচুরিতে ছিল আমার অনিহা। মা বলতেন- এগুলো খেলে নাকি পেটের ক্রিমি মরে তাই বাধ্য হয়ে খেতে হত। আর আটার পিঠা ছিল আমার খুবই পছন্দের খাবার। মেঝু আপা প্রায় বলতেন-আমার জন্ম শীতে হয়েছিল বলে সবাই বেশি করে আটার পিঠা খেয়েছে তাই আমার এত পছন্দ! বলছিলাম রোদ পোহানোর কথা।
হঠাৎ পিছনে এসে সেজু আপা দাঁড়াতেই আমি বলতে থাকি-'ছেবা দেয় ছাউটি তার হউরি বাউটি..." বলতেই সেজু আপা রাগে আমার সাথে তুমুল ঝগড়া শুরু করে দিত এমনকি আমাকে মারতও। শিশুবেলা না বুঝেই বললেও বড় হয়ে জানলাম- এগুলো আমাদের ভাটিবাংলার বাউলশিল্পী শ্রদ্বেয় শফিকুন্নূরের গানের বাক্য।
সিলেট অঞ্চলের অসংখ্য ভাটিয়ালি, জারি-সারি, দেশাত্মবোধক, মারফতি, মুর্শিদি গানের রচয়িতা ও লোকসাহিত্যের অন্যতম সংগ্রাহক ছিলেন বাউলশিল্পী শফিকুন্নূর। সিলেট অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া লোককাহিনীগুলোকে সংগ্রহ করেছেন, সুরের ছন্দে বিভিন্ন আসরে পরিবেশন করে মানুষের ঋদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। তাঁর সংগৃহীত লোকগীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম আপনদুলাল, দেওয়ান কটুমিয়া কিচ্চা, আছলম কুমার, গোল রায়হান, ময়মুনা কুটুনি বুড়ি, শহীদে কারবালা সিলেটের লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তাঁর গাওয়া দেওয়ান কটুমিয়ার কিচ্চা ছোটোবেলা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। যুবকবেলা এসে আমি নিজেও ‘করিমুন্নেছা’ নামে একটি মঞ্চনাটক লিখি। যেটা দেওয়ান কটুমিয়া ও তাঁর স্ত্রী করিমুন্নেছার কাহিনী নিয়ে রচিত। আমার গানের গুরু শ্রী বিদিত লাল দাসের প্রযোজনায় থিয়েটার বাংলা নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিল ২০০৯ সালে এম সাইফুর রহমান অডিটোরিয়ামে। নাটকটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তখন।
বাউলশিল্পী শফিকুন্নূরের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৫ জুন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জগদল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁর পিতা আব্দুল মন্নান একজন রাজনীতি সচেতন মানুষ ও স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, মায়ের নাম বিবিজান বিবি। গানের হাতিখড়ি মায়ের কাছে। শিক্ষাজীবন শুরু হয় জগদল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর জগন্নাথপুরের জগদীশপুর সফায়েত উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় পড়েন, দিরাই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক ও সিলেট এমসি কলেজ থেকে ফার্মাসিস্ট ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবন শুরু করেন কুলঞ্জ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু শত ব্যস্ততার মাঝেও সঙ্গীত চর্চায় ভাটা পড়েনি।
তিনি ১৯৭৩ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জগদল ইউনিয়নের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৬৮ সালে সিলেট বেতারে প্রথম সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে বেতার শিল্পী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। এরপর বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। শিল্পীদের নিয়ে ১৯৭৮, ১৯৮৬, ১৯৮৮, ও ১৯৯২ সালে কয়েকবার ভারত ও ইংল্যান্ড সফর করেন। তিনি ১৯৯৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ইহলোক ত্যাগ করেন। বিবাহিত জীবনে তিনি ৩ পুত্র ও চার কন্যার জনক।
আমাদের পাইকাপন গ্রামের পূর্বজামখলা হাটিতে ‘রইদরাজা’গানটি সরাসরি তাঁর কণ্ঠে শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। সাথে ছিলেন হাল্কাপাতলা এক বাদ্যযন্ত্রী। এই স্মৃতিচারণ মনে করে যখন আলোচনা করছিলাম বাউলশিল্পী শফিকুননুর ও তাঁর গান 'রইদরাজা' নিয়ে তখনই আমার আলোচনার ফাঁকে আমাকে একটু থামতে বলেন বাদ্যযন্ত্রী বাউল নিশিকান্ত দাস বাবু। তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে বললেন- সেদিনের সেই হাল্কাপাতলা বাদ্যযন্ত্রী যুবকটি ছিলাম আমি। ত্রিশ বছর অধিক পরে,আমার ৪৩ বছর বয়সে তাকে সরাসরি আবার দর্শন করলাম। যাকে দেখেছিলাম ১৪/১৫ বছর বয়সে। তিনি কবি মিজানুর রহমান মিজানের সাথে এসেছিলেন সিলেট ওসমানী মেডিকেল রোড আল শফিক হোটেলের নীচতলার একটি রুমে আমার অসুস্থ শ্বশুর পল্লীবাউল জবান আলী ফকিরকে দেখতে। নিশিকান্ত বাবুই আমাকে 'রইদ রাজা গানের এক অজানা গল্প বলেন ঠিক এভাবে-"বাউলশিল্পী শফিকুননুর যখন এই গানটি লিখেন তখন 'পূবের বাড়ির সুন্দর খইন্যা' ছিল না। সেখানে লিখেছিলেন-'হিন্দু বাড়ির সুন্দর খইন্যা!'
আমি বললাম- এতে কী হিন্দু সম্প্রদায়কে হেয় করা হলো না! তিনি তখন বাক্যটি পরিবর্তন করে লিখলেন-'পূবের বাড়ির সুন্দর খইন্যা'। এবার বুদ্ধি করে বললেন-'এখন যদি পূবের বাড়ির মুসলিমরা আপত্তি করে তাহলে বলবো এই বাক্যের অর্থ আসমানের পূবে যে সূর্য ওঠে তাকেই 'পূবের বাড়ির সুন্দর খইন্যা' বলেছি।
আহা! কী মজাকরে কৌশলে গানের একটি বাক্যের পরিবর্তন করেছিলেন বাউলশিল্পী শফিকুননুর। তাঁর বেশ কয়েকটি গান গ্রামে গ্রামের শিশু-কিশোর, যুবা-বৃদ্ধ নরনারির মুখে মুখে এখনও উচ্চারিত হয় রঙেঢঙে, ক্রোধ ও আক্ষেপে। তেমনই আরেকটি গান-"তাই গেল তাই'র বাফের বাড়িত আমার কী উফায়...।" এই গানে গ্রামের একজন সহজ সরল কৃষকের আক্ষেপ ও অভিমানের চিত্র অনিন্দ্যরূপে বাউলশিল্পী শফিকুননুর তাঁর গানে তুলে ধরেছেন।
আমাদের কৈশোরে শীতকালের এমন কোনো দিন নেই,সকালে মিষ্টিরোদে বসে 'রইদরাজা' গানের বাক্য বলিনি! এই গানের আরেকটি বাক্য আমরা ভাইবোন মিলে শীতের রাতে কাঁথা বা লেপের নীচে ঘুমানোর সময় আওড়াতাম যেমন-"শীত খরে গো বুড়া মাই খেতার তলে জাগা নাই,খেতা নিল হিয়ালে (শিয়াল) আইন্না দিব বিয়ালে (বিকালে) বলেই সবাই মিলে হায়রে কী লেপকাঁথা টানাটানি করে হুলস্থুলই না করতাম। পরিশেষে মায়ের মিষ্টি বকুনী খেয়ে কবে যে ঘুমিয়ে যেতাম ঠাওর পেতাম না। মাঝেমধ্যে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার রাতে সবাই আগুন তাবাতে গিয়ে এই বাক্যটি বলতাম-"রইদবেটা রাজা মানুষ খরে তাজা, আগুনবেটা কুড়িয়া মানুষ দেয়না ছাড়িয়া।" বাউলশিল্পী শফিকুননুরের গীতিবাক্যের এই আবেদন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিনাশি সত্ত্বা হয়ে মিশে আছে। এরকম আরও অনেক গান বাউলশিল্পী শফিকুননুর লিখেছেন। তাঁর প্রতিটি গানই হাওরাঞ্চল মানুষের কথা বলে। যা অক্ষয় অমলিন হয়ে হাওরাঞ্চল মানুষের মনে ঠিকে থাকবে আজীবন।
বাউলশিল্পী শফিকুননুরের সব গানগুলো সরকারিভাবে সংরক্ষণ করে গবেষণা করলে আমাদের লোকসাহিত্য সমৃদ্ধ হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু আফসোসের বিষয়, আমরা এমনও দেখেছি তেলবাজ কিছু গবেষকদের তেলবাজিতে অনেক অখ্যাতরা বিখ্যাত হয়েছেন চামচা নির্ভর এই রাষ্ট্রালয়ে। পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মান! প্রকৃত গুণিরা ভাটিবাংলার কালজয়ী লোককবি বাউলশিল্পী শফিকুননুরের মতোই এখনও অজ্ঞাতবাসে রয়ে গেছেন। শফিকুন্নূর যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টিকর্মের মাঝে।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক
পাইকাপন,দরগাপাশা,শান্তিগঞ্জ,সুনামগঞ্জ।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: