অলীক প্রেমের বিলাসিতা
পৃথিবীতে আমরা বসবাস করছি এখন পুঁজিবাদের যুগে। হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, "পুঁজিবাদী পর্বের সবচেয়ে বড়ো ও জনপ্রিয় কুসংস্কারের নাম প্রেম।" সত্যি বলতে পুঁজিবাদ এখন পৃথিবীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে, পুঁজিবাদে আচ্ছন্ন মানব জীবন ও পুরো পৃথিবী। তবে পুঁজিবাদ বলেন আর যাই বলেন বাস্তবতা বাস্তবতার নিয়মেই চলবে, প্রেম আর ভালোবাসাও চলবে যুগের সারথী হয়ে। সবকিছু ফেলে যখন আমরা প্রেম আর ভালোবাসার নীড়ে আশ্রয় খুঁজি তখন বলতে হয় জীবনে প্রেম ভালোবাসার প্রয়োজন আছে। তাইতো মাঝে মধ্যে বা কখনও কখনও নিজেকেও প্রেমিক রুপে আবিস্কার করতে হয়। যেমনি বিপ্লবীরা প্রেমিক হয় ঠিক তেমনি। তাই প্রেমকে যতই কুসংস্কার বা যাই বলা হোক না কেন জগতে প্রেম ছিল, আছে এবং থাকবেই। এটা বোধহয় অন্তিম অবধি কম আর বেশি হোক থাকবেই। তবে এটাও সত্যি যে বাস্তবতার কাছে প্রেম ক্ষনিকের বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়! অবশ্য ভালোবাসা সেখানে ভিন্নকিছু। কেননা চাইলে সবাইকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু সবার সাথে প্রেম হয় না। প্রেম হতে পারে প্রকৃতির সাথে, আবার ভালোবাসা সকল মানবের তরে। আর দুইটার একত্রিত হয় বিশেষ কারোর জন্য কিংবা বিশেষ কিছু মানুষের জন্য। হতে পারে সে আপনার প্রেমিক/প্রেমিকা অথবা স্বামী/স্ত্রী এমন কেউ। সুতরাং প্রেমের মাঝেই জীবন সীমিত নয় বরং সেটা ভালোভাবে ফুটে উঠেছে কল্পনায়। জীবনের বাস্তবতার কাছে প্রেম নিছকই বটে! কারণ প্রেমের আসল সৌন্দর্য মূলত ফুটে উঠে কল্পনায়, আর জীবনের সৌন্দর্য বোধহয় বাস্তবতায়। জীবনকে বাস্তবতা দিয়ে দেখতে হয়, বিচার করতে হয়। জীবনের প্রথম বাস্তবতাই হচ্ছে জীবন। তারপরই আপনাকে ভাবতে হবে দেশ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি ও পুঁজিবাদ অতঃপর পরবর্তীকালে সময়ে সময়ে আরও যা আসবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে এক্ষেত্রে, যদিও অতিরঞ্জিত পুঁজিবাদকে আমি নিজেই এতটা পছন্দ করিনা তবুও সত্যি বলতে আমি বা আমরা পুঁজিবাদের শেকলের বাহিরের কেউ নই। যেখানে পুরো পৃথিবীকে পুঁজিবাদ গ্রাস করেছে সেখানে কোনো না কোনোভাবে আমাদেরকে পুঁজিবাদের নিকট দারস্থ হতেই হয়। তবে অতিরঞ্জিত পুঁজিবাদ ও চলমান সমাজ ব্যবস্থায় আমার অবশ্য ভয় আছে। কেননা অতিরঞ্জিত পুঁজিবাদ আবার ভালো নয় আর চলমান সমাজ ব্যবস্থার কথা তো আর বলে লাভ নেই! যেন শামসুর রহমানের, "উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ।" পুঁজিবাদেরও একটা সীমা রেখা থাকতে হবে অবশ্যই। অতিরঞ্জিত পুঁজিবাদ নিজের মধ্যে ভর করলে এমনও হতে পারে যে একদিন এই পুঁজিবাদ'ই নিজের জন্য অশনি হয়ে দাড়াতে পারে। যেমন, পৃথিবীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ডুকেছে যখন পুঁজিবাদ /অতিরঞ্জিত পুঁজিবাদই একদিন খনন করবে মরণ ফাঁদ! এইজন্য পুঁজিবাদ থেকেও সাবধান ও সতর্ক থাকা শ্রেয়। কেননা পুঁজিবাদ আমাদের খিদেটা বাড়িয়ে দিয়েছে। আর এই খিদের যন্ত্রণা অনেক মানুষকে আর মানুষ থাকতে দেয় না। বাস্তবতায় যখন পুঁজিবাদ জীবনের সাথে আড়ষ্ঠ হয়ে আছে তখন ফেলেও দিতে পারছিনা আবার তার বিরুদ্ধে বিপ্লবও করতে পারছিনা। তবে বোধকরি আমাদের একদিন মুক্তি হবে।
কথা হচ্ছে প্রেমকে আমরা যতই বিলাসিতা অথবা আর যাই বলিনা কেন মানুষের যখন একটা মন আছে জীবনে সে একবার হলেও প্রেমের সান্নিধ্য যাবেই। একবার কেন প্রয়োজনে বারবার যাবে। কবিতার ভাষায় যেন এমনটিই প্রকাশ পায়;
মানুষেরই তো আছে মন, নেই যার মন, তবে সে কোনজন!
মানুষেই তো খোঁজে অনুভূতি, উপলব্ধি মনের কোনে আসে যখন।
জীবন যেন হয়ে যায় কখনও, জীবননান্দ দাশের কাব্যর মতন!
উড়ে বেড়ায় আকাশে বাতাসে মন চায় তার যখন তখন।
মানুষেরই তো প্রেম আসে প্রকৃতির উদাসীন ডাকে,
ভালোবাসার আচ্ছাদনা মন ঘিরে নেয় যখন তাকে!
প্রকৃতির নিয়ম মেনে, প্রেম আসে মানবের মনে।
কে বলে প্রেম নাই মনের স্তরে, জানেনা সে জীবনের মানে।
প্রেম আছে সকল মানবের তরেই। কেউ প্রকাশ করে, কেউ করেনা। আবার কেউ কেউ ভিন্ন ভিন্ন ভাবেও প্রকাশ করে। তবে ক্ষনিকের প্রেম, ক্ষনিকের জন্য ঠিক আছে। আগেই বলেছি, মানুষের যখন মন আছে প্রেম আসবেই। তবে সেখানে আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া বর্তমান সময়ে এসে বোকামি। প্রেমে পড়লেই প্রেম করতে হবে এই নিয়ম পৃথিবীর কোথাও নেই! নইলে প্রেম না করার অপরাধে মৃত্যুর মিছিলে ছেয়ে যেত পুরো আকাশ। আমাদের বুঝতে হবে এখন আর 'রোমিও-জুলিয়েট' বা 'লাইলি-মজনু'র যুগ নয়। আর এখনকার সময়ে যে প্রেম ভালোবাসা টিকে তার অধিকাংশেই দুজনের চাওয়া-পাওয়া আর জৈবিক চাহিদায় রূপ নিয়েছে। বোধকরি এটাই হওয়ার ছিল। কেননা প্রেমিক-প্রেমিকার সুযোগ্য আবাস্থল পৃথিবীতে এখনো হয়ে উঠেনি! এখানে প্রেমকে বিসর্জন দিয়ে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। কারণ এখন জীবন মানেই যুদ্ধ। তারপর জীবন মানেই এখন সাহিত্য। সাহিত্যের মাধ্যমে জীবনের সকল বাস্তবতা উঠে আসে। যেখানে থাকবে দেশ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষা ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রেমও অবশ্য থাকবে, যে প্রেমে সকল বাস্তবতা থাকবে, বাস্তবতার মাধ্যমে ফুটে উঠবে। কিন্তু জীবনের সাহিত্য রচনা করতে এসেও যারা শুধু অলীক প্রেমের উপাখ্যানেই পড়ে থাকেন তাদের সাহিত্য থেকে আর কতটুকু জীবন পড়া যায়! আমার কাছে লেখালেখি বা সাহিত্য একটা বিপ্লবের নাম। সাহিত্যের মাধ্যমেও যে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব সেটা ফরাসী বিপ্লবের দিকে চোখ বুলালেই দেখতে পাবেন। কিন্তু লেখালেখিটা কি সহজ কিছু? অবশ্যই না। তবে যারা সাহিত্যের নামে ফুল-পাখি, লতা-পাতা আর অলীক প্রেমের উপাখ্যানের সাহিত্য রচনা করেন তাদের জন্য হয়ত সহজ। কিন্তু এটা মূলত সাহিত্য না। যারা সত্যিকারে সাহিত্য রচনা করেন তাদের জন্য লেখালেখি সহজ কিছু না। তাদেরকে অনেক কিছুই উপেক্ষা করে লেখালেখি করতে হয়। বোধকরি তারাই সাময়িক জনপ্রিয়তা-কে ছাপিয়ে গিয়ে বিখ্যাতদের কাতারে পৌঁছনোর পথে আগমন করেন।
কিন্তু আপনারা যারা প্রেমের মধ্যে সুখের কারণ খোঁজেন এবং প্রেমকে বিয়েতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন, তাদের এই চেষ্টাকে আমি সাধুবাদ জানাই। সত্যি বলতে প্রেমের মধ্যে আমিও সুখ খুঁজি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা হতাশ করে। মানুষ এখন বিয়ে করছে সাধারণত দুটি কারণে। একটা যদি হয় সামাজিকতা তাহলে অপরটি হচ্ছে ব্যক্তি স্বার্থ। বর্তমান প্রচলিত উদ্ভট সমাজের 'সামাজিকতা' অর্থে বিয়ে বলতে সমাজের একটা নিয়মকে রক্ষা করা। এটা হচ্ছে দুটি মানুষের একই সঙ্গে সংসার করা। তারপর যদি হয় ব্যক্তি স্বার্থে বিয়ে - তার ভিতরে আরও দুটি কারণ থাকতে পারে। যথা 'মানসিক সুখ' ও 'জৈবিক সুখ'। বিয়ে থেকে মানসিক সুখ এখন প্রায় উঠে গেছে। এটা আমাদের সমাজের দিকে চাইলেই দেখা যাবে, যেভাবে দিন দিন বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা সেদিকে খেয়াল করলেই। বাকি রইল 'জৈবিক সুখ'। এখন যদি কেউ শুধুমাত্র জৈবিক সুখের জন্য বিয়ে করতে চায়, তারমানে সে চাচ্ছে স্থায়ী ভাবে একজন 'দেহরক্ষী'। যার সাথে সে স্থায়ী ভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে পারবে। তবে সেখানে একে অপরের প্রতি কোনো সম্মান বোধ থাকবে না, থাকবে না জৈবিক চাহিদায় এককেন্দ্রিকতা হওয়ারও নিশ্চয়তা।
জীবনের চালিকায় পৃথিবী নিয়ে আপনাকে ভাবতেই হবে। কারণ পৃথিবীতে আমরা শুধু প্রেম করতে আসিনি। মনে রাখবেন, পৃথিবীতে আমি বা আপনি না আসলে পৃথিবীর কোনো ক্ষতিই হত না। তবুও পৃথিবী আমাদের থাকতে দিয়েছে, বাঁচতে দিয়েছে। তার বিনিময়ে পৃথিবীকে নিয়ে আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে। তেমনি সাহিত্যের মাধ্যমেও পৃথিবীকে ভাবতে হবে, পৃথিবীর মানুষকে নিয়ে ভাবতে হবে। মাও সে-তুঙ বলেন, "সাহিত্য মানুষের কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় অপারগ হলে, এবং সে সাহিত্য যদি মানুষের জীবনকে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে না পারে, তা হলে তা প্রকৃত ও সৎ সাহিত্য হতে পারে না।"
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: