ইতিহাসে হযরত গোলাব খান (রহ:) ও ফতেহপুর মোল্লাবাড়ি
নোমান আল-মনসুর
ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হিদায়ত ও সংশোধনের জন্য কিছু বিশেষ বান্দাকে নির্বাচন করেছেন। নবী-রাসুলদের পর যাঁরা নবুওয়াতের উত্তরাধিকার বহন করেছেন, তাঁরা হলেন আউলিয়া-ই-কিরাম। তাঁদের জীবন ছিল নিঃস্বার্থ ত্যাগ, ইখলাস, তাকওয়া ও আল্লাহমুখী সাধনায় পূর্ণ। বাংলার মাটি—বিশেষত সিলেট অঞ্চল—এই আউলিয়ায়ে কিরামের পদচারণায় ধন্য। ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতিবিজড়িত এই পবিত্র ভূমিতে জন্ম নিয়েছেন বহু সুফিসাধক, যাঁদের অবদান আজও লোকজ স্মৃতি ও আধ্যাত্মিক সংস্কৃতিতে জীবন্ত।
এই ধারাবাহিকতায় এক অনন্য নাম হলেন হযরত গোলাব খান (রহ:)—যিনি গোলাপ শাহ নামেও সুপরিচিত। তাঁর জীবন কেবল কেরামতনির্ভর কিংবদন্তি নয়; বরং তা সিলেট অঞ্চলের সামাজিক, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
হযরত গোলাব খান (রহ:) জন্মগ্রহণ করেন বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার ঐতিহাসিক ফতেহপুর গ্রামে। এই গ্রামটি শাহজালাল (রহ:)-এর স্মৃতিবিজড়িত হওয়ায় প্রাচীনকাল থেকেই ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকভাবে সমৃদ্ধ। যে বাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, তা আজও “ফতেহপুর মোল্লাবাড়ি” নামে পরিচিত—যা তাঁর বংশীয় পরিচয় ও ওলীত্বের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর পিতা ছিলেন শাহ বাবুল খান (রহ:)—একজন ধর্মপ্রাণ, আল্লাহভীরু ও সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি। মাতা-পিতার কাছ থেকেই হযরত গোলাব খান ছোটবেলা থেকেই দ্বীনের প্রতি গভীর অনুরাগ লাভ করেন। তবে আল্লাহর হুকুমে অল্প বয়সেই তিনি পিতা-মাতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হন। পিতার ইন্তেকালের কিছু বছর পর তাঁর মায়েরও পরলোকগমন ঘটে। ফলে তিনি ও তাঁর বড় ভাই শাহ গুলজার খান (রহ:) এতিম হয়ে পড়েন। এই এতিমত্বই সম্ভবত তাঁর জীবনে বৈরাগ্য ও আল্লাহনির্ভরতার বীজ বপন করে।
শাহ গুলজার খান (রহ:)-এর বংশধারা ফতেহপুর মোল্লাবাড়িতে অব্যাহত থাকে তাঁর পুত্র শাহ সিকান্দার খান (রহ:)-এর মাধ্যমে। উল্লেখ্য সিকান্দার খান সাহেব নিজ এলাকায় ধর্ম প্রচার করতে থাকেন। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বালিকান্দি গ্রামের আল্লাহর ওলী সৈয়দ রফাসাত আলী এই সিলসিলার একজন বুজুর্গ।সিকান্দার খানের কোনো পুত্রসন্তান না থাকায়, তাঁর স্ত্রী বংশের রক্তধারা রক্ষার জন্য কন্যার পুত্র মৌলভী শাহ রেদওয়ান উদ্দিন খান-কে মোল্লাবাড়িতে নিয়ে আসেন।
মৌলভী শাহ রেদওয়ান উদ্দিন খান ছিলেন গোরারাই গ্রামের সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যক্তি মোহাম্মদ আলম সাহেবের জ্যেষ্ঠপুত্র। তিনি ছিলেন অত্যন্ত শিক্ষিত, প্রজ্ঞাবান ও আলেমে দ্বীন—যিনি পরবর্তীকালে এই অঞ্চলের ধর্মীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই বংশীয় ধারাবাহিকতা ফতেহপুর মোল্লাবাড়িকে শুধু একটি আবাসস্থল নয়, বরং একটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
হযরত গোলাপ খান (রহ:) পিতার নিকট প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। এরপর গ্রামের মক্তবে ভর্তি হন। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—দুনিয়াবি পড়াশোনা তাঁর মনকে আকর্ষণ করে না। কিতাবি বিদ্যার চেয়ে তাঁর মন টানত নির্জনতা, ধ্যান ও ইবাদতের দিকে।
এই উদাসীনতা নিয়ে বড় ভাই গুলজার খান বহুবার চেষ্টা করলেও তাতে কোনো ফল হয়নি। বরং তাঁর ছন্নছাড়া জীবনযাপন ও লোকালয় থেকে দূরে থাকার প্রবণতা তাঁকে এলাকায় এক রহস্যময় চরিত্রে পরিণত করে।
লোকমুখে প্রচলিত আছে, সামান্য একটি মোরগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি একদিন বড় ভাইয়ের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলেন। বিদায় মুহূর্তে তিনি বলেন—“আমার এই সম্পত্তির ওপর কারো হক নেই। আমি চললাম আল্লাহর পথে।”
এই কথার মধ্য দিয়েই শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—নিরুদ্দেশ সাধনা। তিনি বাড়ি ত্যাগ করেন এবং দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর লোকচক্ষুর আড়ালে কাটান।
পাঁচ বছর পর ফতেহপুর গ্রামের নিকটবর্তী ঈদুলপুর জঙ্গলে, একটি বৃহৎ বৃক্ষতলে তাঁকে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় দেখতে পান এলাকার লোকজন। তাঁকে ঘিরে এক ধরনের আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি হয়। সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে তাঁকে দেখার জন্য।
কিন্তু খ্যাতি ও ভীড় থেকে দূরে থাকাই ছিল তাঁর সাধনার মূলনীতি। অতিরিক্ত জনসমাগম দেখে তিনি বাহাদুরপুরের নিকটবর্তী তৎকালীন বরাক নদীতে ডুব দিয়ে আত্মগোপন করেন। নদীর স্রোতের সঙ্গে মিলিয়ে যান—যেন দুনিয়ার আলোড়ন থেকে নিজেকে আড়াল করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
পরবর্তীতে জানা যায়, তিনি কিছুদিন বালাগঞ্জ এলাকায় অবস্থান করেন। এরপর স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন বিয়ানীবাজার উপজেলার কসবা মৌজার ইমামবাড়ী নামক স্থানে। এখানেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে ফলপ্রসূ অধ্যায় শুরু হয়। ইমামবাড়ীতে তিনি ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, তাকওয়া, ইখলাস ও মানবসেবার দাওয়াত দিতে থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর চারপাশে ভক্ত ও অনুসারীদের একটি বলয় গড়ে ওঠে। তাঁর কথাবার্তা, দোয়া ও জীবনাচরণে মানুষ আল্লাহর নৈকট্যের স্বাদ পেত। আজও ইমামবাড়ী এলাকার মানুষের মুখে মুখে তাঁর কেরামতের কাহিনি প্রচলিত।
হযরত গোলাব খান (রহ:)-এর কেরামতের মধ্যে কলেরা উপদ্রবের ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফতেহপুর গ্রামে এক সময় মারাত্মক কলেরা দেখা দিলে গ্রামের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। তখন তারা ছুটে যায় বিয়ানীবাজারে—তাদের প্রিয় সন্তানের কাছে।
তিনি তাঁদের নির্দেশ দেন বরাক নদীর পাড়ে, সরকার বাজার সংলগ্ন স্থানে সিন্নি করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করার। এই দোয়ার পর কলেরা উপদ্রব প্রশমিত হয় বলে লোকমুখে প্রচলিত। আজও সেই স্মৃতি বহন করে ফতেহপুর-নাসিরপুর খেয়াঘাটের সিন্নি, যা স্থানীয় লোকসংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।
হযরত গোলাব খান (রহ:)-এর ইন্তেকালও ছিল রহস্যময় ও তাৎপর্যপূর্ণ। একদিন ফজরের পর দীর্ঘ সময় তিনি হুজরা থেকে বের না হলে লোকজন দরজা ভেঙে প্রবেশ করে দেখতে পান—মশারির নিচে শান্ত ও নুরানি নিথর দেহ। কথিত আছে, তিনি জীবদ্দশায় ওসিয়ত করেছিলেন যেন তাঁর কবর পূর্ব-পশ্চিমে করা হয়। প্রচলিত নিয়মের ব্যতিক্রম হওয়ায় আলেমরা এতে আপত্তি জানান। কিন্তু দাফনের পরপরই কবরটি অলৌকিকভাবে পূর্ব-পশ্চিম দিকে ঘুরে যায়—যা উপস্থিত সবাইকে বিস্মিত করে এবং তাঁর ওলীত্বের সাক্ষ্য বহন করে।
হযরত গোলাব খান (রহ:) কেবল একজন অলৌকিক সাধক নন; তিনি সিলেট অঞ্চলের সুফি ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি। ফতেহপুর মোল্লাবাড়ি থেকে ইমামবাড়ী পর্যন্ত তাঁর জীবন আল্লাহপ্রেম, ত্যাগ ও মানবকল্যাণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
আজ তাঁর মাজার, মাদ্রাসা ও ঈদগাহ শুধু স্থাপনা নয়—এগুলো একটি আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার। আমাদের দায়িত্ব হলো এই ইতিহাস সংরক্ষণ করা, বিকৃত কিংবদন্তির আড়াল থেকে সত্যকে তুলে ধরা এবং তাঁর জীবন থেকে তাকওয়া ও ইখলাসের শিক্ষা গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদেরকে এই মহান ওলীর রেখে যাওয়া পথে নিজেকে পরিচালিত করে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভ করার শক্তি দান করেন—আমিন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটির তথ্য-উপাত্ত কিছুটা পারিবারিক সূত্রে জানা এবং কিছুটা গোলাব শাহ রহ: হাফিজিয়া মাদ্রাসা বিয়ানীবাজার এর সুবর্ণজয়ন্তীতে বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মরহুম এম এ আজিজ সাহেবের প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত।
লেখক :
নোমান আল-মনসুর
বার্মিংহাম
৬ জানুয়ারি ২০২৬
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: