স্বপ্নের বাড়ি : সজীব মাহমুদ
পাহাড়ের আড়াল ভেদ করে সূর্য যখন প্রতিদিন প্রথম আলো ছড়ায়, সেই আলো আমার বাড়ি আর উঠানে এসে পড়ে । আর আমি, সূর্যের সোনালী সে রোদ গায়ে মেখে মেখে বড় হয়েছি । আমি বড় হয়েছি পাহাড়ি গ্রামের এক উঁচু টিলার বুকে । এখানে বাতাসে লেগে থাকে পাহাড়ি ফুলের গন্ধ আর পাখিরা গান গায় ভোরের প্রার্থনায় । এই আমার ' স্বপ্নের নীল পাহাড়ি বাড়ি'— আমার প্রাণঘর, আমার আত্মার ঠিকানা।
সুনামগঞ্জের সীমান্তঘেঁষা টেংরাটিলা গ্রামে এই বাড়িটি টিলার উপর দাঁড়িয়ে আছে। এ যেন সময়ের বুক চিরে ওঠা এক নিঃশব্দ প্রহরী। আশেপাশে তেমন ঘরবাড়িও নেই। উঠান থেকে তাকালে চোখ হারিয়ে যায় দিগন্তজোড়া সবুজের বন আর দূরে ভারতের মেঘের কন্যা মেঘালয়ের পাহাড়ে।
এই বাড়ির তিন চত্ত্বরেই আমার বেড়ে ওঠা— শৈশব, কৈশোর আর এখনকার আমি। কোনো এক জ্যোৎস্নামাখা রাতে যখন পৃথিবী নিঃশব্দে ঘুমাচ্ছিল, এই বাড়িতেই আমি প্রথম কান্নায় পৃথিবীকে জানিয়েছিলাম আমার আগমন। এ বাড়ির মাটির নিচে পোঁতা আছে আমার নাড়ি, হয়তো সেই কারণেই এ মাটির গন্ধ পেলেই আমার চোখ ভিজে ওঠে।
যখন বাড়ি ছেড়ে দূরে যেতে যাই, অদৃশ্য কোনো শেকল পায়ের কাছে জড়িয়ে ধরে। তাই আমি কখনো বেশিদিন বাড়ি ছাড়া থাকতে পারি না। এই বাড়ি শুধু ইট-গাঁথা এক আশ্রয় নয় — এ যেন আমার মায়ের বুকের এক টুকরো উষ্ণতা।
আমার বাবা নিজ হাতে গেঁথেছিলেন এই বাড়ির প্রথম ইট। তখন টিলা বাড়িটি ছিলো জঙ্গলময় আর রাত নামলে শেয়ালের ডাক ভেসে আসত। সেই ভয় কাটিয়ে বাবা গড়ে তুলেছিলেন আমাদের আশ্রয়। সেই আশ্রয় এখন আমার পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ কোণ ।
আজ বাবা নেই। তবু তাঁর গড়া এই বাড়ি এখনো নিঃশব্দে আমাদের আগলে রাখে। বয়সের ভারে দেয়ালে ফাটল ধরেছে, রঙ মুছে গেছে, তবুও এ ঘর যেন মায়ের কোলে রাখা এক উষ্ণ আশ্রয়।
এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল জানে আমার হাসি, কান্না, অপেক্ষা আর হারিয়ে ফেলা বিকেলগুলোর কথা। ভরা পূর্ণিমার রাতে যখন আলো ছড়িয়ে পড়ে উঠোনজুড়ে, আমি ইলেকট্রিসিটির লাইট নিভিয়ে চুপচাপ বসে থাকি। বাড়ি আর উঠানে জুড়ে তখন বাতাসে এক বুনো ফুলের অদ্ভুত আচেনা মিস্টি গন্ধ আসে। তখন মনে হয়— বাবা এখনও উঠানে আমার পাশে বসে আছেন আর চুপচাপ তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে। নরম কন্ঠে গল্প করছেন কিভাবে তিল তিল পরিশ্রম করে গড়ে তুলেছেন তাঁর স্বপ্নের বাড়িটি। এসব ভাবতে গিয়ে হঠাৎ ঘোর ভাঙে আমার, মনে পড়ে - আহা! বাবা তো নেই। বাড়িটি বাবার অস্তিত্ব জানান দেয় বার বার । বাবা নেই এ বাড়িতে কেটে গেছে কয়েকটি বছর।
এখন আমার আর কোন স্বপ্নের বাড়ি নেই, কখনো ইচ্ছেও করে না যে নতুন কোন বাড়ি বানাই। এ বাড়িটি নিয়েই আমার স্বপ্ন, আমার ভালোবাসার স্মৃতিমাখা ভুবন, যেমন আছে তেমনটিই থাকুক। নতুন করে স্বপ্নের বাড়ি বানানোর কথা ভাবলেই ভয় হয়, প্রিয় স্মৃতি ভঙ্গের ভীষণ ভয়।
লেখক :
আইনজীবী ও গল্পাকার
এ রহমান
মন্তব্য করুন: