অবশেষে নিলামে গেল হাওরখাল: লুটপাট নিয়ে যা জানা গেল
Led Bottom Ad

অবশেষে নিলামে গেল হাওরখাল: লুটপাট নিয়ে যা জানা গেল

রোদ্দুর ‍রিফাত, নিজস্ব প্রতিবেদক

০১/১২/২০২৫ ১৭:৪৯:৩৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

দেশের শীর্ষতম হাওরের নাম হাকালুকি হাওর। এই হাওরের একটি অংশের নাম ‘হাওরখাল’ বিল। বড়লেখা উপজেলাধীন এই হাওরটিতে প্রবেশের একটি পথ গেছে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মোকামবাজার হয়ে। আর অপর পথ জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার খোজাউড়া হয়ে। চারদিকে বিস্তৃত এই ‘হাওরখাল’ বিল প্রহরায় রয়েছে ২৫ জন পাহারাদার। বিলে মৎস্য আহরেণের জন্য জেলে রয়েছেন ৫০ জন। যারা জলমহালের তদারকিসহ বিলের যাবতীয় কার্যক্রম করে থাকেন। গেল বছর লিজ নিয়ে জলমহালটিতে মামলা মোকদ্দমা থাকায় রিট পিটিশন নং ১৫৬৬৪/২০২৪ এ স্থগিতাদেশ আসে। ফলে ১৪৩২-১৪৩৭ বাংলা সনের ইজারা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। জলমহাল নীতিমালা অনুযায়ী জলমহালটি তখন জেলা প্রশাসকের খাস খতিয়ানে চলে আসে। খাসখতিয়ান পরবর্তী বিলে মৎস্য আহরণের জন্য একটি খাসকালেকশন কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির উদ্যোগে ২৫ নভেম্বর প্রথম জাল ফেলে মাছ তোলা হয়। প্রথম দিনে মৎস্য উত্তোলনকালে উপস্থিত ছিলেন ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারি ইউসুফ জাবের। প্রকাশ্য নিলামে মাছ বিক্রির পর বেলা সাড়ে ৩ টা দিকে কিছু মাছ জিম্মায় রেখে এসে তিনি স্থান ত্যাগ করেন। কিন্তু ওইদিনই বিকাল সাড়ে ৫ টার দিকে ৪০ থেকে ৫০ জনের সশস্ত্র একদল মানুষ জোরপূর্বক বিলে প্রবেশ করে জিম্মায় রাখা নৌকা বোঝাই প্রায় লাখ তিনেক টাকার মাছ লুট করে নিয়ে যায়। বিলে প্রহরী থাকলেও অস্ত্রধারীদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারেনি। এই ঘটনার পর জড়িত অভিযোগে নাম আসে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ জনপ্রতিনিধিদের। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা জোড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।


এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রবিবার (৩০ নভেম্বর) সরেজমিন ঘটনাস্থল তদন্তকালে পাওয়া গেছে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২৫ নভেম্বর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠানিকভাবে মাছ আহরণ করা হলেও এর আগে জল মহালটির কিছু অংশে পরীক্ষামূলক জাল ফেলে মাছ তোলা হয়। বিলে পাহারার দায়িত্বে থাকা ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া গ্রামের মৃত আবদুল কাদিরের ছেলে পিকুল মিয়া (৫৫) জানান,রবিবার (৩০ নভেম্বর) পর্যন্ত বিলটিতে জাল ফেলা হয়েছে মাত্র ৩ দিন। মৎস্য আহরণ কালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা, সহাকারী কমিশনার (ভূমি), থানা পুলিশসহ খাস কালেকশন কমিটির লোকজন উপস্থিত থেকে প্রকাশ্য নিলামে মাছ বিক্রি করেন। শনিবার (২৯ নভেম্বর) মা্ছ বিক্রি হয় ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। পরদিন  রবিবার (৩০ নভেম্বর) শুনেছি প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার মতো মাছ নিলামে বিক্রি হয়েছে। তার দেওয়া তথ্যমতে এই পর্যন্ত (মঙ্গলবার,বৃহস্পতিবার,রবিবার ও সোমবার) ৪ দিনে মোট মাছ বিক্রয়ের পরিমান ৭ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। 


দুই কোটি টাকার মাছ লুট হয়েছে এবং প্রায় ১৭ দিন যাবত মাছ ধরা হচ্ছে-এই বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে মোকামবাজারের দোকানদার আবুল বাশার জানান, মাছ ধরা এবং বিক্রি করতে হলে গাড়ি নিয়ে বিলটিতে আসতে হবে এই পথ ধরেই। কারণ পশ্চিম পাড় দিয়ে জলমহালটিতে আসতে হলে অনেকটা পথ হেঁটে এবং নৌকা করে আসতে হবে। তাই পূর্ব পাড় অর্থ্যাৎ মোকামবাজার দিয়েই সকলকে আসতে হয়। মাছ বিক্রিও হয় পূর্বপাড়েই। তিনি জানান, রাতে জাল ফেলে চুরি করে মাছ বিক্রি করা হলে সেটি আমাদের জানার কথা নয়। তবে চলতিবছর উপজেলা প্রশাসনের খাস কালেকশনে মাত্র চার দিন জাল ফেলে মাছ তোলা হয়েছে। ৪ দিনে বিক্রি করা মাছ ১০ লাখ টাকার মতো হতে পারে বলে জানান তিনি। 


বিলে দায়িত্ব পালনকারী অপর প্রহরী পেয়ার আলী (৫০) বলেন, ‘আমরা চেরাগ আলীর হয়ে জলমহালে দায়িত্ব পালন করছি’। চেরাগ আলী কে-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চেরাগ আলী উপজেলা পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের তদারকি এবং নির্দেশ প্রদান করেন। এর বেশি আর কিছু জানি না’। 


বিলে মাছ লুটের বিষয়ে তিনি বলেন, ঘটনা ঘটেছে পশ্চিম পাড়ে। পূর্বপাড়ে দায়িত্ব পালনকালে পশ্চিমপাড়ের কিছু দেখা যায় না। কারণ-অনেক দূরত্ব। তবে পরদিন শুনেছি,পশ্চিমপাড় দিয়ে জাল ফেলে মাছ তোলা হয়েছে। কে বা কারা মাছ তোলেছেন, সে বিষয়ে কিছুই জানা যায় নি। 


এদিকে ২৫ নভেম্বর মাছ লুটপাটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরদিন ২৬ নভেম্বর বড়লেখা থানায় অজ্ঞাতনামা ৪০/৫০ জনের নামে থানায় একটি অভিযোগ দাখিল করেন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বীরবল কান্তি চৌধুরী। তিনি অভিযোগে স্বাক্ষি হিসেবে জয়নাল আবেদিন, সফর আলী ও আবদুল জলিল নামে তিন ব্যাক্তির নাম উল্লেখ করেন। এজহারে বীরবল কান্তি চৌধুরী উল্লেখ করেন, মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) বিকাল সোয়া ৫ টার দিকে ৪০/৫০ জনের একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী লাটি-সোটা ও দেশিয় অস্ত্র নিয়ে নিলামে বিক্রির জন্য ২ টি নৌকা থেকে ৩০/৪০ ক্যারট ছোট মাছ নিয়ে যায়। এজহারে মাছের আনুমানিক বাজারদর উল্লেখ করা হয়েছে ১ লক্ষ টাকা।   


এজহারে সাক্ষি হিসেবে নাম থাকা বড়লেখা উপজেলা বিএনপির আহবায়ক জয়নাল আবেদীনের কাছে মুটোফোনে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন-মামলা-মোকদ্দমা থাকায় বিলটি যেহেতু লিজ দেওয়া যাচ্ছে না,সেহেতু নিয়ম অনুযায়ী সরকারি খাস খতিয়ানভূক্ত হয়ে তহসিলধারের মাধ্যমে জলমহাল তদারকিসহ খাস কালেকশন কমিটির মাধ্যমে মাছ আহরন ও বিক্রয় করা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে-তদারকি করা দরকার,বিক্রিত টাকাগুলো সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে কী না। তাছাড়া, রাতের অন্ধকারে জাল ফেলা ও নৌকা থেকে জোরপূর্বক মাছ লুট করার ঘটনায় জড়িত একজন মানুষেরও নাম জানা গেল না-বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। তিনি বলেন, দোষীদের নাম উল্লেখ না করায় কেউ কেউ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে-যে বিষয়টি খুবই দু:খজনক। তিনি অবিলম্বে মাছ লুট কাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জোর দাবি জানান।  


এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলেও সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাঈমা নাদিয়া বলেন, ১৪৩২ বাংলা সনের বাকী সময়ের জন্য হাওরখাল জলমহালটি লিজ দেওয়া হয়েছে। আজ সোমবার (১ ডিসেম্বর) ২২ টি মৎস্যজীবী সংগঠন এই প্রকাশ্য নিলাম প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন।এর মধ্যে সর্বোচ্ছ দরদতা হিসেবে একটি সংগঠনকে জলমহালটি সরকারের পক্ষে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়। 


২৬ নভেম্বর বড়লেখা থানায় দায়েরকৃত মামলার অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে-তিনি বলেন, পুলিশ কোন আসামী ধরতে পেরেছে-এমন তথ্য আমাদের জানা নেই। তাঝাড়া, জড়িত ব্যক্তি কারা-তাও আমরা জানতে পারিনি। 


বড়লেখা ইউএনও গালিব চৌধুরী জানান—উপজেলা প্রশাসনের বিশাল দায়িত্ব রয়েছে। এর বাহিরে গিয়ে জলমহাল নিয়মিত দেখাশোনা করা, মাছ তোলা বা বিক্রয় করার মতো যথেষ্ট সময় থাকান কথা নয়। তিনি জানান, পরিস্থিতির সমাধানে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে আজ সোমবার জলমহালটি প্রকাশ্যে নিলাম ঢাকা হয়। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় জনকল্যাণ মৎস্যজীবী সমিতির অনুকুলে লিজ দেওয়া হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে ওই সমিতি মৎস্য আহরন ও বিক্রয়সহ জলমহালে যাবতীয় কার্যক্রম তদারকি করবেন। 


এ বিষয়ে জানতে চাইলে বড়লেখা থানার অফিসার-ইন-চার্জ মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লাকে কয়েকবার কল দিলেও সাড়া পাওয়া যায় নি।


ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad