দিরাই–শাল্লা শত্রুমুক্ত দিবসে উপেক্ষিত শহীদদের স্মৃতি
Led Bottom Ad

দিরাই–শাল্লা শত্রুমুক্ত দিবসে উপেক্ষিত শহীদদের স্মৃতি

নিজস্ব প্রতিনিধি, শাল্লা

০৭/১২/২০২৫ ১৮:৫৩:৪৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর—দিরাই ও শাল্লার মানুষের কাছে এই দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি স্বাধীনতার আলো ছুঁয়ে ফেরা এক অনন্য মুহূর্ত। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের শেষে সেদিন দু’টি উপজেলাই শত্রুমুক্ত হয়। হাওরের বাতাসে ভেসে আসে বিজয়ের আনন্দ, আর ঘরে ঘরে ফিরে আসে স্বাধীনতার প্রথম নিশ্বাস। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেই লুকিয়ে থাকে অসংখ্য বেদনার স্মৃতি—হারা স্বজনের মুখ, ধ্বংস হওয়া জীবনের হিসেব, পেরুয়া গণহত্যার কালো ছায়া।


মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতেই হাওরের মানুষ নির্ভীকভাবে লড়ে গেছেন। দুর্গম পথ, জলাভূমির অন্তহীন বিস্তার—সবকিছুই তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন স্বাধীনতার জন্য। কিন্তু প্রতিরোধের সেই পথে পেরুয়া গ্রামের মানুষকে হানাদারদের নির্মমতার ভয়াবহ মূল্য দিতে হয়েছিল। বহু পরিবার চিরদিনের মতো ভেঙে গিয়েছিল। এই ঘটনার ক্ষত আজও পুরো অঞ্চলের হৃদয়ে দগদগে হয়ে আছে।


ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা দিরাই ও শাল্লা ছাড়তে বাধ্য হয়। ৭ ডিসেম্বরের সকালটি তাই হয়ে ওঠে উৎসবমুখর—লাল–সবুজ পতাকা যখন আকাশে উড়তে থাকে, মানুষ চোখের জল আর হাসির মাঝে খুঁজে পায় মুক্তির অর্থ। স্বাধীনতার সে মুহূর্ত এখনো প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে কাঁপা গলায় ফিরে ফিরে আসে।


প্রতি বছর এ দিনটিতে শহীদদের স্মরণে নানা আয়োজন হয়। শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, স্মরণসভা, প্রার্থনা—সব মিলেই দিনটি হয়ে ওঠে শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতার প্রতীক। কিন্তু এবছর শাল্লা উপজেলা প্রশাসনের উদাসীনতা স্থানীয়দের হৃদয়ে বাড়তি ক্ষত তৈরি করেছে। শহীদদের প্রতি আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জানানো হয়নি—এ অভিযোগে মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মনে গভীর হতাশা।


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের পরামর্শে কেবল ভবনে পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অনেকেই বলেছেন—তাদের কেউ কোনো উদ্যোগ সম্পর্কে জানায়নি।


মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক নিখিল দাস বলেন, “এই দিনটি আমাদের অস্তিত্বের দিন। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো শুধু দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের মানসিক ঋণ। আজ তা পালন না হওয়ায় খুব কষ্ট পেয়েছি।”


স্থানীয় এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ক্ষোভ নিয়ে বলেন, “যারা শহীদদের সম্মান দিতে পারে না, তাদের হাতে স্মৃতির দায়িত্বও সুরক্ষিত থাকে না।”


দিরাই–শাল্লার মানুষ বিশ্বাস করে—স্বাধীনতার আনন্দ যেমন তাদের, তেমনি সেই অর্জনের মূলে থাকা প্রতিটি শহীদের স্মৃতিও তাদের মানসিক প্রতিশ্রুতি। তাই শত্রুমুক্ত দিবসে নীরবতা ও অবহেলা যেন আরো বেশি ব্যথা হয়ে ধরা দেয়।


স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও এই অঞ্চলের মানুষ শহীদদের আত্মত্যাগকে বুকের ভেতর আগলে রাখে। কারণ তারা জানে—এই মাটির প্রতিটি পদক্ষেপে লুকিয়ে আছে সেই বীরদের পদচিহ্ন, যাদের ত্যাগেই আজকের বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে।

প্রীতম দাস

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad