শীতের ডাকে হাওরে পাখিরা,সক্রিয় শিকারিরা!
Led Bottom Ad

শীতের ডাকে হাওরে পাখিরা,সক্রিয় শিকারিরা!

কামরান আহমদ, মৌলভীবাজার

১৩/১২/২০২৫ ১৯:৫৪:৩৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

শীতের হালকা ছোঁয়া লাগতেই হাওরের আকাশে শুরু হয়েছে চেনা কোলাহল। দূর দেশ পেরিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি ফিরে আসছে মৌলভীবাজারের হাওর–খাল–বিল আর জলাশয়ে। কুয়াশাভেজা ভোরে তাদের ডানার শব্দে যেন আবার প্রাণ ফিরে পায় হাওর। প্রতিবছরের মতো এবারও প্রকৃতি তার আপন অতিথিদের বরণ করে নিচ্ছে।


কিন্তু এই আনন্দের ছবির আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর এক বেদনা। পাখি শিকার নিষিদ্ধ হলেও শীতের শুরুতেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে শিকারিরা। ফলে আগের মতো আর নিরাপদ নেই হাওর। কমে যাচ্ছে পরিযায়ী পাখির আনাগোনা, নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি প্রজাতিরাও। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাকারী এসব পাখি আজ আতঙ্কে ডানা মেলছে।


রাজনগরের কাউয়াদীঘি হাওর এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, হাওরপারের মাঠে মাঠে পাতা হয়েছে জাল। কাশিমপুর এলাকার বিস্তীর্ণ জমিতে খুঁটি গেড়ে টাঙানো জাল যেন মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাতের আঁধারে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে উড়ে যাওয়া পাখিরা অজান্তেই আটকা পড়ছে এসব জালে। ভোরের আলো ফোটার আগেই তাদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়—বাজারে বিক্রি বা গোপন হাতবদল।


স্থানীয়রা জানান, ওয়াপদা–কাশিমপুরসহ হাওরপারের কয়েকটি এলাকায় নিয়মিত জাল, বন্দুক কিংবা এয়ারগান ব্যবহার করে পাখি শিকার করা হয়। শীত পুরোপুরি না আসতেই পরিযায়ী পাখির আগমনে শিকারিদের তৎপরতা বেড়ে গেছে। হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরের খেতের ধারে, বিলের পাশে রাতের অন্ধকারে পাতা জাল চোখে পড়ে না; তাতেই ধরা পড়ে অসংখ্য পাখি। কোনো কোনো এলাকায় বিষটোপ ব্যবহারের ঘটনাও শোনা যায়—যা হাওরের জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ সংকেত।


মাঝেমধ্যে আশার আলোও দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু সচেতন মানুষের হাতে উদ্ধার হয়ে পাখি অবমুক্ত হওয়ার ছবি–ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। কালেম পাখি বা সরালি হাঁস আবার ডানা মেলে ফিরে যায় আকাশে। কিন্তু এসব ঘটনা হাতে গোনা; অধিকাংশ শিকারই থেকে যায় অন্ধকারে।


হাওরপারের অনেক বাড়িতে এখনো সাদা বক, পানকৌড়িসহ নানা পাখি রাত কাটায়। ভোরে তারা দলে দলে হাওর আর মাঠে উড়ে যায়, সন্ধ্যায় ফিরে আসে আশ্রয়ে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে টর্চের আলো আর বন্দুকের শব্দে সে আশ্রয়ও আর নিরাপদ থাকে না। বাধা দিতে চাইলেও সবাই পারে না।


পরিবেশবিদরা বলছেন, পাখি শুধু সৌন্দর্য নয়—হাওরের প্রাণ। পরিযায়ী পাখি জলজ পরিবেশকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আইন আছে, নিষেধাজ্ঞা আছে, কিন্তু প্রয়োগ আর নজরদারির ঘাটতিতে শিকার থামছে না। তাদের আহ্বান, জীববৈচিত্র্য আর হাওর বাঁচাতে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।


বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, হাট–বাজারে অভিযান চলছে, পাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত করা হচ্ছে। তবে জনবলসংকট বাস্তবতা। সচেতনতা বাড়ানো, স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নেওয়া আর নিয়মিত নজরদারিই পারে হাওরের আকাশে আবার নিশ্চিন্তে ডানা মেলার সুযোগ করে দিতে।


শীতের হাওয়ায় যখন হাওর ডাকে তার অতিথিদের, তখন সেই ডাক যেন আর মৃত্যুঘণ্টা হয়ে না বাজে—এই প্রত্যাশাই আজ হাওরবাসীর।

ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad